যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (এআরটি) থেকে কতটুকু সুবিধা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করছে বাংলাদেশ এটি কীভাবে ব্যবহার করছে তার ওপর। তাই চুক্তির শর্ত, সম্ভাবনা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও খোলামেলা আলোচনার ওপর জোর দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল তিন দিনব্যাপী ‘ইউএস ট্রেড শো’র সমাপনী দিনের সেমিনারে এসব বিষয় উঠে আসে। ‘বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারটি যৌথভাবে আয়োজন করে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) ও ঢাকার মার্কিন দূতাবাস।
আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অ্যামচেমের সহসভাপতি ও মেটলাইফ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আলা উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘এআরটি তিনটি অনুশাসন অনুসরণ করতে বলছে। শ্রম, ডিজিটাল অনুশাসন ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি। যখন কোনো কারখানায় এআরটি সুবিধা নিশ্চিত থাকবে, তখন আমেরিকানসহ অন্য বিনিয়োগকারীরা লগ্নি করতে আরো আস্থা পাবেন।’ বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্কের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও সহযোগিতা বজায় রাখা দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এইচএসবিসি বাংলাদেশের সিইও মাহবুব-উর রহমানের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরো বক্তব্য দেন অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর; ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান ও এমডি মঈন উদ্দিন হাসান রশিদ; শাশা ডেনিমসের এমডি শামস মাহমুদ এবং কটন ইউএসএর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ আলী আরসালান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন অ্যামচেমের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল।
সেমিনারে সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘চুক্তির ভালো ও মন্দ উভয় দিক অনুধাবন না করলে এর সুফল পুরোপুরি ভোগ করা সম্ভব নয়। এ নিয়ে গোপনীয়তা না রেখে বিস্তারিত আলোচনার উদ্যোগ নেয়া উচিত। এ চুক্তি অন্য দেশগুলোর জন্য একটি অনুসরণীয় মাপকাঠি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটি দেশের প্রবৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা বাড়াতে ভূমিকা রাখলেও নীতি অনুসরণ ও পণ্যের উৎসস্থল চিহ্নিতকরণ বাধ্যতামূলকের কারণে খরচ বৃদ্ধি পাবে।’ বাংলাদেশকে সে অনুযায়ী পূর্বপ্রস্তুতি নিতে হবে বলেও জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির পূর্ণ সুযোগ নিতে দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। অন্যদিকে এ বাণিজ্য নীতির সুফল নিতে দক্ষতা আরো বাড়াতে হবে। কারণ, শুল্কচুক্তি ও এলডিসি উত্তরণ—দুটি একে অপরের পরিপূরক।’ এজন্য কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে শাশা ডেনিমসের এমডি শামস মাহমুদ বলেন, ‘চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় এক বছর পার হলেও এর সুফল কীভাবে রফতানিকারকদের কাছে পৌঁছাবে, তা নিয়ে সরকারি দপ্তরগুলোর সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি। তবে এ চুক্তির ফলে বাংলাদেশে অনেক নতুন মার্কিন ক্রেতার আগমন ঘটছে এবং অন্য দেশের মাধ্যমে ইউএস কটনে তৈরি পোশাক রফতানির নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।’
কটন ইউএসএর প্রতিনিধি আলী আরসালান জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ‘গ্রেট আমেরিকান কটন প্ল্যান’র অধীনে ইউএস কটন ব্যবহার করে পোশাক তৈরিতে পূর্ণ শুল্ক ছাড়ের সুযোগের কথা বলা হয়েছে। তবে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে।
সেমিনারে পারস্পরিক বাণিজ্য ব্যবস্থার আওতায় নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ, ব্যবসা ও শিল্প খাতে এর সম্ভাব্য প্রভাব এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরো জোরদার করার বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার, রফতানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পারস্পরিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে কথা হয়। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা, বেসরকারি খাতের সহযোগিতা এবং স্থিতিশীল বাণিজ্য পরিবেশের প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন তারা।










