সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সাল ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশনস (ইউএফএস) লিমিটেডের বিরুদ্ধে চার মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ হামজা আলমগীরসহ অন্যদের বিরুদ্ধে অর্থপাচার আইনে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি। সম্প্রতি বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

গতকাল বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তদন্ত কমিটির দাখিল করা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচুয়াল ফান্ড) বিধিমালা ২০০১-এর বিভিন্ন বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুসারে ফান্ডগুলোর পরিচালনার বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা বিভিন্ন পক্ষের বিরুদ্ধে কমিশন কর্তৃক বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালার সংশ্লিষ্ট বিধি অনুসারে সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানি ইউএফএস লিমিটেডের নিবন্ধন সনদ কেন বাতিল হবে না সেজন্য নোটিস জারি করা হবে। অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইউএফএস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ হামজা আলমগীর ও তার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, এ প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক, সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ অনুসারে মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

ফান্ডগুলোর ট্রাস্টি হিসেবে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা অনুসারে সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানি, এর পরিচালক, কর্মকর্তা তথা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাচার করা তহবিল, অপরাধলব্ধ আয়, অবৈধ ব্যয় তথা অনাদায়কৃত অর্থ পুনরুদ্ধার বা পুনর্ভরণের জন্য বিশেষ নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। ফান্ডের ট্রাস্টি ও কাস্টডিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায়ে আইসিবির ট্রাস্টি ও কাস্টডিয়ান বিভাগে সে সময় কর্মরত কর্মকর্তাদের মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালার সংশ্লিষ্ট বিধি অনুসারে কেন শাস্তি দেয়া হবে না সেজন্য নোটিস জারির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

অনিয়মকৃত চার ফান্ডের বিধিবদ্ধ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান আহমেদ জাকের অ্যান্ড কোম্পানি, রহমান মোস্তফা আলম অ্যান্ড কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তদন্ত প্রতিবেদনটি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিষয়টি সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত আলোচ্য দুই নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং এর সব অংশীদারকে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানি, সব ধরনের সমন্বিত বিনিয়োগ স্কিম যেমন মিউচুয়াল ফান্ড, অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড, এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) ও বাজার মধ্যস্থতাকারী সব প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা কার্যক্রম ও অ্যাসিউরেন্স কার্যক্রম পরিচালনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বিএসইসি।

প্রসঙ্গত, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ইউএফএসের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনাধীন ইউএফএস আইবিবিএল শরিয়াহ ইউনিট ফান্ড, ইউএফএস পপুলার লাইফ ইউনিট ফান্ড, ইউএফএস পদ্মা লাইফ ইসলামিক ইউনিট ফান্ড ও ইউএফএস-ব্যাংক এশিয়া ইউনিট ফান্ড থেকে ১৭০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে বিএসইসির তদন্ত কমিটি। এর মধ্যে ভুয়া কমার্শিয়াল পেপারে বিনিয়োগ দেখিয়ে ৫৮ কোটি ৯০ লাখ, ভুয়া এফডিআর ও এমটিডিআরের মাধ্যমে ৪৭ কোটি ৯২ লাখ ও শেয়ার বিক্রির পর বেআইনিভাবে অর্থ উত্তোলন ও স্থানান্তরের মাধ্যমে ৬৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) বেশি দেখানোর মাধ্যমে ম্যানেজমেন্ট ফি ও ট্রাস্টি ফি বাবদ ৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা অতিরিক্ত ফি আদায়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে চার ফান্ড থেকে ১৭৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়া কমার্শিয়াল পেপারে বিনিয়োগের সুদ, এফডিআর, এমটিডিআরের সুদ ও অতিরিক্ত আদায় করা ফি বাবদ ইউএফএসের কাছ থেকে ২৩৫ কোটি টাকা আদায়ের বিষয়ে সুপারিশ করেছে বিএসইসির তদন্ত কমিটি। এক্ষেত্রে অর্থের পরিমাণ নির্ধারণে বিশেষ নিরীক্ষার সুপারিশ করেছে কমিটি। এরই মধ্যে ইউএফএসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ হামজা আলমগীর চার ফান্ডের অর্থ আত্মসাৎ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে পালিয়ে গেছেন।