নতুন করে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধিতে ফের লকডাউনের পথে এগোচ্ছে চীন। আগামী সপ্তাহে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন সামনে রেখে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করছে সরকার। সাংহাইসহ বেশ কয়েকটি শহরে করোনা বিধিনিষেধ আরোপের ফলে শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হবে এবং তার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে। চলমান অনিশ্চয়তার ফলে চীনের শ্রমবাজারে ভয়াবহ পরিণতি নেমে এসেছে।

দ্য স্ট্রেইটস টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত রোববার চীনে নতুন করে করোনা আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৮৭৮ জন, যা প্রায় দুই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চে উঠে এসেছে। সাংহাইয়ে আক্রান্ত হয়েছে ৩৪ জন। যে এলাকায় সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে সে এলাকা লকডাউনের আওতায় আনা হয়েছে। সাংহাইয়ের দুটি জেলায় সিনেমা হল ও অন্যান্য বিনোদন কেন্দ্র গতকাল থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। চীনের এ বাণিজ্য কেন্দ্রটিতে লকডাউনের হানা ফের শঙ্কা নিয়ে হাজির হয়েছে ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিগুলোর জন্য। চলতি বছরের শুরুতে সাংহাই, কুনশানসহ বেশ কয়েকটি শহরে কয়েক মাসব্যাপী লকডাউনে বিপর্যস্ত হয়েছে চীনের অর্থনীতি এবং অস্থিরতা দেখা দিয়েছে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে।

পরবর্তী সপ্তাহে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন সামনে রেখে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাপের মুখে রয়েছে স্থানীয় সরকার। গুরুত্বপূর্ণ এ সম্মেলনে তৃতীয়বারের মতো দলে ও সরকারে নিজের অবস্থান সুসংহত করবেন শি জিনপিং।

রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন করে সংক্রমণের খবরে গতকাল লকডাউন আরোপ করেছে চীনের শানজি প্রদেশের ফেনিয়াং সিটি। নিকটবর্তী ইনার মঙ্গোলিয়াতেও কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে রাজধানী হোহতে বাইরে থেকে আসা গাড়ি ও যাত্রী প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত ১২ দিনে ইনার মঙ্গোলিয়ার রাজধানী শহরে দুই হাজারের বেশি করোনা সংক্রমণের খবর পাওয়া গিয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় কংগ্রেস সামনে রেখে বড় আকারের করোনা সংক্রমণের মুখোমুখি হতে চান না পার্টির নেতারা। তবে সরকারের জিরো কভিড পলিসি দেশটির অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয় নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও অস্থায়ী কর্মীদের জন্য মাথাব্যথার কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বেইজিংয়ের জিরো কভিড পলিসিতে দেশটির শ্রমবাজারে মারাত্মক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তৃতীয় প্রান্তিকে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমপ্লয়মেন্ট সেন্টিমেন্ট সূচক ৩৫ দশমিক ৪ পয়েন্টে নেমে এসেছে। ২০১০ সালে এ ডাটা সংরক্ষণ শুরুর পর যা সর্বনিম্ন। শতাধিক রিয়াল এস্টেট ডেভেলপারের উপাত্তের ভিত্তিতে দেখা গিয়েছে, সেপ্টেম্বরে নতুন বাড়ি বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে।

চীনের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে শ্লথগতির কারণে রফতানি হ্রাস পেয়েছে। এতে দেশটির অসংখ্য অভিবাসী শ্রমিকের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দানা বেঁধেছে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্রয়াদেশে ভয়াবহ পতনের জেরে গত জুলাইয়ে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে ডংগুয়ান কপ্পো ইলেকট্রনিক। বিদেশী ব্র্যান্ডগুলোর জন্য ব্লুটুথ হেডসেট তৈরি করে আসছিল কোম্পানিটি। তৈরি পোশাক ও জুতা উৎপাদনকারী অনেক ছোটখাটো প্রতিষ্ঠানও ক্রয়াদেশে পতনের ফলে কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি অঞ্চলটির অন্যতম সফল কোম্পানি হিসেবে পরিচিত আলকো সম্প্রতি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। প্রায় ৩৬ বছর সচল থাকার পর সম্প্রতি কারখানা ও ব্যবসা বন্ধের ঘোষণা দেয় ইলেকট্রনিকস পণ্য নির্মাতা কোম্পানিটি। ভালো সময়ে হাজারো কর্মী ছিলেন আলকোতে, বর্তমানে তার ক্যাম্পাস জনশূন্য হয়ে পড়ে রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

বন্ধের আগে হংকংভিত্তিক কোম্পানিটি জানায়, প্রলম্বিত মহামারীতে তাদের রফতানিমুখী বাণিজ্য মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। বড় অংকের লোকসান গোনার ফলে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য কঠিন ঠেকেছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও বিশ্বব্যাপী ইলেকট্রনিকস পণ্য রফতানি নিয়ে কারখানা সরগম ছিল। কিন্তু এখন সেখানে কয়েকজন প্রহরী রয়েছেন মাত্র। একের পর এক কারখানা বন্ধের ফলে অনেক অভিবাসী শ্রমিককে পাততাড়ি গুটিয়ে গ্রামে ফিরে যেতে হচ্ছে।

চীনের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল রফতানিমুখী খাত। কিন্তু দুই বছর ধরেই তাতে ভয়াবহ পতন দেখা যাচ্ছে। গত আগস্টে চীনের রফতানি বছরওয়ারি কমেছে ৭ দশমিক ১ শতাংশ। সাধারণত ক্রিসমাসের কেনাকাটার জন্য এটি থাকত চীনের ব্যস্ততম মাস। এমনকি গত দুই বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি কমেছে তাদের। আগস্টে দেশটির কারখানা কার্যক্রম সূচক দাঁড়িয়েছে ৪৯ দশমিক ৫ পয়েন্ট। গত জুলাইয়ে যা ছিল ৫০ দশমিক ৪ পয়েন্ট।

চীনের রফতানির বেহাল কাছ থেকে অনুভব করছেন দেশটির ২৮ কোটিরও বেশি অভিবাসী শ্রমিক। হুবেই প্রদেশের বাসিন্দা কাই বাও (৩০) জানান, শ্রমিকরা ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছেন। নতুন কর্মী নিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাজের সন্ধানেও বের হতে পারছেন না। লকডাউনের ফলে ভ্রমণে জটিলতা তো রয়েছেই। তিনি আরো জানান, তার মতো আরো ৭০ জন কর্মীর আয় অর্ধেকেরও বেশি কমেছে।