যুক্তরাষ্ট্রে চাকরির বাজারে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। কভিড মহামারী থেকে উত্তরণ, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের রেশ থেকে সৃষ্ট পরিস্থিতিসহ নানা কারণে মন্দার শঙ্কার মুখে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি। তবে এর মধ্যেও কর্মসংস্থান খাতের অগ্রগতি উল্লেখ করার মতো অবস্থায় রয়েছে। সর্বশেষ গত মাসেও ৩ লাখ ১১ হাজার নতুন কর্মী চাকরিতে প্রবেশ করেছেন। যে সংখ্যাকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বলে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এমনকি নতুন কর্মী নিয়োগে প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ডে বিস্ময়ও প্রকাশ করেছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। আর এ প্রবৃদ্ধির পেছনে অবদান রেখেছে বার ও রেস্তোরাঁগুলোর পুনরুদ্ধার। খবর বিবিসি।
জানুয়ারিতে বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হয়, যা ১৯৬৯ সালের পর সর্বনিম্ন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়িয়েই চলেছে। ২০০৭ সালের পর এখন সুদের হার সর্বোচ্চে রয়েছে। চাকরির বাজার কর্মীদের জন্য সুখবর নিয়ে এলেও দেশটির অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের চাপে রয়েছে। এ চাপ নিয়ন্ত্রণে সরকারের তরফ থেকে নানা ধরনের পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং ঋণের উচ্চহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এক ধরনের মিশ্র সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বেশ কয়েকটি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি বছর মন্দার আশঙ্কা অনেক বেশি। বিশেষ করে ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়া, উৎপাদনে ধীরগতি এবং বাড়ি বিক্রির পরিমাণ অনেক বেশি কমে গেছে, যার সূত্র ধরেই মন্দার পূর্বাভাস দেয়া হচ্ছে। তবে এমন পরিস্থিতির মধ্যেও শ্রমবাজার শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এমনকি যে অর্থনীতিবিদরা শ্রমবাজারের অবস্থা নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী দিয়েছিলেন, তারাও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
মার্কিন আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান চার্লস সোয়াব করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিচার্ড ফ্লিন বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে চাহিদা কমছে এমন আভাস পাওয়া না যাচ্ছে, কর্তৃপক্ষ ধরে নেবে যে মূল্যস্ফীতির হার তীব্র রয়েছে এবং এটির প্রশমন প্রয়োজন।
জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের প্রধান জেরোমি পাওয়েল চলতি সপ্তাহেই সতর্ক করে বলেছেন যে বেঞ্চমার্ক সুদের হার সামনের দিনগুলোয় আরো বাড়ানো হতে পারে। এ বৃদ্ধি প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে নেয়া পদক্ষেপ স্থবির হয়ে পড়েছে বলেও নিজের দুশ্চিন্তার কথা জানান তিনি। জেরোমি পাওয়েল বলেন, চাকরির বাজার চাঙ্গা হলে তা দ্রব্যমূল্যের ওপর একধরনের চাপ সৃষ্টি করে।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঘণ্টাভিত্তিক যে মজুরি ছিল, এ বছর তার তুলনায় বেড়েছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রমবাজারে কর্মী সংকট বেশ প্রকট হয়ে উঠেছিল। এ সংকট সমাধান করতেই মূলত মজুরি বাড়ানো হয়েছে। মার্কিন শ্রম বিভাগের সর্বশেষ প্রতিবেদন তা-ই বলছে। অবশ্য শ্রমবাজারে ইতিবাচক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির পরেও অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কা কাটছে না। কিছু বিশ্লেষক বলছেন, এসব কিছুর পরও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি তীব্র পতনের মুখে পড়তে পারে। সেই সঙ্গে মন্দার চূড়ায় ওঠার শঙ্কাও ফেলে দেয়া যাচ্ছে না।
ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় ভোক্তাদের খরচের ওপর প্রভাব ফেলছে, ব্যয় নিয়ন্ত্রিত করে দিচ্ছে। অন্যদিকে উচ্চ সুদের হার জীবনযাপনকে আরো ব্যয়বহুল করে তুলছে। বিশেষ করে ব্যবসার জন্য ঋণ নেয়া অনেক ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। আবার বাড়ি ও গাড়ি কেনার জন্য পরিবারগুলোর ঋণ নেয়াও অতিরিক্ত খরচের হয়ে গেছে।
তবে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ইকোনমিকস বিভাগের অধ্যাপক জাস্টিন ওলফার্স বলছেন ভিন্ন কথা। তার মতে, অর্থনৈতিক মন্দার যে ভয় দেখানো হচ্ছে, তা আদতে অতিরঞ্জিত। সবার জন্যই অর্থনীতি আগের চেয়ে ভালো অবস্থায় আছে এবং এমন থাকবে বলেই প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এ অধ্যাপক বলেন, উচ্চ সুদের হার সাধারণত প্রবৃদ্ধির গতিকে ধীর করে দেয়। ফলে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বৃদ্ধির পদক্ষেপ চাকরির বাজারের শক্তিশালী অবস্থানকে পুরোপুরি অদৃশ্য করে দিতে পারবে না। তিনি বলেন, ‘অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অবস্থা বোঝার জন্য সবেচেয়ে ভালো পূর্বাভাস হলো বর্তমান অবস্থা। আর বর্তমান অবস্থা যেহেতু ভালো আছে, ভবিষ্যৎও ভালোই হবে। এটা ঠিক যে মন্দার একটি আভাস দেখা যাচ্ছে, কিন্তু এটাও ঠিক যে বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র মন্দার মধ্যে নেই।’










