বিশ্বের সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত আবাসন কোম্পানির চায়না এভারগ্রান্ড গ্রুপকে অবসায়নের নির্দেশ দিয়েছেন হংকংয়ের একটি আদালত। এ রিয়েল এস্টেট জায়ান্ট ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ঋণ পুনর্গঠন করার বিষয়ে চুক্তিতে পৌঁছতে ব্যর্থ হওয়ায় এ নির্দেশ এসেছে। খবর সিএনএন।

শেনজেনভিত্তিক এভারগ্র্যান্ড ২০২১ সালে চীনের আবাসন খাতের পতনের প্রতীক হয়ে ওঠে। গত বছরের জুনের শেষে কোম্পানিটির দেনা ছিল ৩২ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের বেশি। গত সেপ্টেম্বরে এভারগ্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান জু জিয়াইনকে অপরাধে জড়িত সন্দেহে পুলিশ আটক করে।

চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম রিয়েল এস্টেট কোম্পানি হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এভারগ্র্যান্ড ২০২১ সালের শেষের দিকে ঋণদাতাদের কাছে তার আর্থিক বাধ্যবাধকতা পূরণে ব্যর্থ হয়। সে ব্যর্থতা আবাসন খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করে, যার অভিঘাত চীনের বৃহত্তর অর্থনীতিতে লাগে। এক সাবেক চীনা কর্মকর্তা গত বছর জানিয়েছিলেন, চীনের মোট জনসংখ্যা ১৪০ কোটি মানুষের থাকার চেয়েও বেশি সম্পত্তি রয়েছে। নানা কারণে ক্রেতারাও নতুন অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এতে অবিক্রীত, খালি ও ইনস্টলমেন্ট আটকে যাওয়া ফ্ল্যাটের সংখ্যা বেড়েই চলছে। এর সঙ্গে জড়িত কোম্পানিগুলোর দেনা আবাসন খাতের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা চীনের অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম একটি কারণ।

এমন পরিস্থিতিতে এভারগ্র্যান্ডের পুনর্গঠন বড় একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। আইনজীবীরাও বিচারকের সামনে কার্যকরী পুনর্গঠন পরিকল্পনা নিয়ে আসতে ব্যর্থ হয়েছেন। গতকাল হংকংয়ের আদালতে সে পরিপ্রেক্ষিতে সংস্থাটির অবসায়ন প্রক্রিয়ার পক্ষে রায় দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সম্পদ বিলি-বণ্টনেরও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। 

২০২২ সালে হংকংয়ে একজন পাওনাদার এভারগ্র্যান্ড গ্রুপের বিরুদ্ধে একটি উইন্ডিং-আপ পিটিশন দাখিল করেন। মূলত এর মাধ্যমে অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে বিভিন্ন পক্ষের চুক্তির চেষ্টার কারণে মামলাটি ২০২৪ সাল পর্যন্ত টেনে আনা হয়।

কার্যকর পুনর্গঠন প্রস্তাব ও আর্থিক অসচ্ছলতা দূরীকরণে কোম্পানির পক্ষ থেকে অগ্রগতির সুস্পষ্ট অভাব দেখেছেন বলে গতকাল জানান হংকংয়ের হাইকোর্টের বিচারক লিন্ডা চ্যান। সংস্থার অবসানের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‌আমি মনে করি, আদালতের পক্ষে কোম্পানি বন্ধের আদেশ দেয়া যথাযথ এবং আমি তাই এ আদেশ দিচ্ছি।’

এভারগ্র্যান্ড এরই মধ্যে আবাসন খাতে ব্যর্থতার বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে অবসায়নের আদেশ চীনের আর্থিক ব্যবস্থাকে ব্যাপক মাত্রায় প্রভাবিত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। হংকংয়ের পুঁজিবাজারে গতকাল সকালের লেনদেন শেষ হওয়ার আগেই আদালতের নির্দেশনাটি প্রকাশ্যে আসে। যার প্রভাবে এভারগ্র্যান্ডের শেয়ারের দাম ২০ দশমিক ৮৭ শতাংশ নেমে যায়। এ সময় এভারগ্র্যান্ডের সহযোগী বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির কোম্পানির লেনদেন বন্ধ ছিল।

একসময় চীনের জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশে অবদান ছিল নির্মাণ ও আবাসন খাতের। ওই সময় দেশটির আবাসন অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত ছিল এভারগ্র্যান্ড। কিন্তু ২০২১ সালে প্রথমবার ঋণখেলাপি হয় এভারগ্র্যান্ড। একই বছর যুক্তরাষ্ট্রে দেউলিয়া ঘোষিত হয় কোম্পানিটি।

আবাসন খাতের এ ঝুঁকি নিয়ে ওয়াকিবহাল ছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। যদিও একসময় ধারণা করা হয়েছিল, বেল আউট প্যাকেজের মাধ্যমে এ খাতের সবচেয়ে বড় কোম্পানিকে পতনের হাত থেকে বাঁচাতে এগিয়ে আসবে চীন সরকার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। এভারগ্র্যান্ড ও অন্যান্য আবাসন সংস্থার ঋণকে দেশটির আর্থিক ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের জন্য অগ্রহণযোগ্য ঝুঁকি বলে মনে করেছেন শি জিনপিং। এ কারণে ২০২০ সাল থেকে কর্তৃপক্ষ ধীরে ধীরে আবাসন খাতে ঋণের বিষয়ে কঠোর হয়েছে। এর পরের বছরই আলোচনায় কেন্দ্রে চলে আসে ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এভারগ্র্যান্ড।