চীনের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্য সরবরাহে বড়সড় বাগড়া দিয়েছে চলমান লোহিত সাগর সংঘাত। গোলযোগ এড়াতে বিশ্ব বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখা সুয়েজ খালে চলাচল স্থগিত করেছে শিপিং কোম্পানিগুলো। কিন্তু বিকল্প সমুদ্রপথে বেড়েছে সময় ও অর্থের খরচ। সে ঝুঁকি সামাল দিতে রাশিয়ার দীর্ঘ রেলপথের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। লৌহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ায় চীন থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহনে রুশ রেলপথ ব্যবহারের চাহিদা এখন ক্রমেই বাড়ছে। খবর সিএনবিসি।

পণ্য পরিবহনবিষয়ক ডাটা প্লাটফর্ম জেনেটার দেয়া তথ্যানুসারে, গত ১৪ জানুয়ারি শেষ হওয়া সপ্তাহে ভিয়েতনাম ও ইউরোপের প্রধান পোশাক রুটে এয়ার কার্গোর পরিমাণ আগের সপ্তাহের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বাড়ে। কিন্তু দূরপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে কনটেইনার পরিবহনের ছোট একটি অংশ এটি। এর বদলে রাশিয়ার রেলপথের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে আমদানিকারকদের। ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রধান কারণ হলো আকাশপথের চেয়ে রেলপথে খরচ অনেক কম। আবার নৌপথের চেয়ে কম সময়ও লাগে।

এসব কারণে নতুন রুটের অনুসন্ধান ও চাহিদা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বুকিং প্রতিষ্ঠানগুলো। চীন থেকে রাশিয়া হয়ে ইউরোপে আসবাবপত্র, খেলনা, পোশাক ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রাংশ রফতানি করে রেলগেট ইউরোপ। বুকিং প্রতিষ্ঠানটি চিফ বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসার জুলিজা সিগলাইটের মতে, উৎস ও গন্তব্যের ওপর নির্ভর করে এ রুটে পণ্য পরিবহনে ১৪ থেকে ২৫ দিন সময় লাগে। এটি নৌ-পরিবহনের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম সময়।

মূলত গাজায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় লোহিত সাগরের জাহাজে হামলা শুরু করেছিল ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী। গত বছরের শেষ দিকে থেকে ওই পথ এড়িয়ে বিকল্প বেছে নিয়েছে শিপিং কোম্পানিগুলো। আগের হিসেবে চীন থেকে নেদারল্যান্ডসের রটারড্যাম বন্দরে পণ্য পৌঁছতে সময় নিত প্রায় ২৭ দিন। কিন্তু এখন উত্তমাশা অন্তরীপের রুট ধরায় অতিরিক্ত ১০-১২ দিন যোগ করতে হয়।

২০২২ সালে ইউক্রেনে হামলার পর থেকে রাশিয়ার রেলপথের মাধ্যমে পণ্য পাঠানো কমে এসেছিল। কিন্তু লোহিত সাগরের পরিস্থিতিতে তা আবার পুনরুদ্ধারের পথে। জুলিজ সিগলাইট বলেন, ‘ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর অনেক কোম্পানি রাশিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করতে ভয় পেয়েছিল। এ কারণে বুকিংও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। কিন্তু গত বছর থেকে ভালো ট্রানজিট সময় ও দামের কারণে এ রুট পুনরুদ্ধার হচ্ছে।’

লোহিত সাগরে সংঘাত শুরুর পর রুশ রেলপথের চাহিদা আকাশচুম্বী হয়েছে উল্লেখ করে সিগলাইট জানান, নতুন এ চাহিদার সম্পূর্ণ প্রভাব জানতে আরো কয়েক মাস সময় লাগবে। ১০ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে যাওয়া চন্দ্র নববর্ষও এ রুটের চাহিদা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।

ডাচ লজিস্টিক কোম্পানি রেল ব্রিজ কার্গোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইগর তাম্বাকা বলেন, ‘চার সপ্তাহে চীন-ইউরোপ রেল রুটের বুকিং ৩৭ শতাংশ বেড়েছে। লোহিত সাগরে সংঘাত ও চীনের চন্দ্র নববর্ষের কারণে চাহিদার উল্লম্ফন ঘটেছে।’

যন্ত্রাংশ থেকে ইলেকট্রনিকস ও খাদ্যসামগ্রী পরিবহন করে রেল ব্রিজ কার্গো। ইগর তাম্বাকা জানান, অল্প গ্রাহকই রাশিয়া হয়ে পণ্য পরিবহনের বিষয়ে নৈতিক সমস্যায় ভোগেন। বেশির ভাগ গ্রাহক এসব চিন্তা করেন না। ইউরোপে দ্রুত সরবরাহে নির্ভরযোগ্য সমাধান পাওয়াই তাদের লক্ষ্য।

অবশ্য রাশিয়া ছাড়া এশিয়া থেকে স্থলপথে আরেকটি রুট রয়েছে যাকে মিডল করিডোর বলা হচ্ছে। চীন থেকে কাজাখস্তান ও কাস্পিয়ান সাগর হয়ে তুরস্ক পর্যন্ত গেছে এ রুট। তবে এ পথে পণ্য পরিবহনে ২৬-২৯ দিন সময় লাগে। মধ্য করিডোরে সাম্প্রতিক সপ্তাহে বুকিং বেড়েছে বলে জানান অস্ট্রিয়ান অপারেটর ওবিবি রেল কার্গো গ্রুপের মুখপাত্র মারিয়া ম্যাগডালেনা পাভিসিচ। তিনি জানান, নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে গ্রাহকের উদ্বেগের কারণে মিডল করিডোরে তারা মনোযোগ দেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় ইউরোপ ও এশিয়ার গ্রাহকের কাছ থেকে এ রুটের চাহিদা বেশ বেড়েছে। কারণ হিসেবে পাভিসিচ বলেন, ‘‌সমুদ্রের পণ্যবাহী জাহাজের ভাড়া তীব্রভাবে বেড়েছে। সামনে আরো বাড়তে পারে, যা শিগগিরই রেলের কাছাকাছি চলে আসছে।’

এদিকে তাম্বাকা বলেন, ‘‌রেলের মাধ্যমে চীন থেকে ইউরোপে ৪০ ফুট কনটেইনার পাঠানোর খরচ প্রায় ৭ হাজার ৯০০ ডলার। অন্যদিকে চলতি মাসে সমুদ্রের ভাড়া ৬ হাজার ৫০৭ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।’

ব্রিটিশ কোম্পানি ডেভিস টার্নার ২০১৮ সাল থেকে চীন ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে পণ্যবাহী রেল পরিষেবা পরিচালনা করছে। এ পণ্য ট্রাক ও ফেরির মাধ্যমে রাশিয়া, বেলারুশ ও পোল্যান্ড হয়ে জার্মানির ডুইসবার্গ হয়ে চীনের শহর উহান বা জিয়ানের মধ্যে যাতায়াত করে। গত সেপ্টেম্বরে কোম্পানিটি জানায়, চীন ও ইউরোপের রেল সংযোগ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্য সহযোগিতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থলপথে বিকল্প অনুসন্ধান আরো কিছুদিন চলবে। ইনস্টিটিউট অব এক্সপোর্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ট্রেনের মহাপরিচালক মার্কো ফোরজিওন আশংকা করছেন, লোহিত সাগরে সংঘাত সম্ভবত ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এক্ষেত্রে পুরনো সরবরাহ চেইন উদ্ধার করতে অনেক সময় লাগবে। তবে বিকল্প ধরনের পরিবহনের মাধ্যমে সবকিছুর প্রতিস্থাপন করা যাবে না।

রেলপথ নিয়ে চীনের দীর্ঘ পরিকল্পনা রয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে বৈশ্বিক প্রভাব বাড়াতে চায় বেইজিং। যার সঙ্গে রাশিয়ার অন্তরঙ্গ যোগাযোগ রয়েছে। বর্তমানে মধ্য সাইবেরিয়া থেকে দক্ষিণে চীনের দিকে রেলপথ নির্মাণকাজ করছে মস্কো।