বিশ্ব অর্থনীতিতে চলতি বছর প্রবৃদ্ধির হার থাকবে অত্যন্ত ধীর। এমনটাই মনে করছেন বেশির ভাগ বিশ্লেষক। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা ও ব্যবহার স্বাভাবিকভাবেই কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে ঘটছে তার উল্টো। এক-দুই মাসের মধ্যে জ্বালানিটির বাজার সংকুচিত হতে শুরু করবে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল। তার মতে, বছরের দ্বিতীয়ার্ধজুড়ে বাজারে সংকট অব্যাহত থাকবে।

এদিকে সংকটের ফলে দাম আবারো ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠতে পারে। চলতি মাসের শুরুর দিকেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এর মূল কারণ ওপেক প্লাসের উত্তোলন কমানোর ঘোষণা। 

জ্বালানি তেল রফতানিকারক দেশগুলো ও রাশিয়াসহ অন্যান্য মিত্র দেশের জোট ওপেক প্লাস নামে পরিচিত। জোটটি এ মাসের শুরুতে অপ্রত্যাশিতভাবে জ্বালানি তেল উত্তোলন কমানোর ঘোষণা দেয়। এ সিদ্ধান্তের আওতায় প্রতিদিন ১৬ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল করে উত্তোলন কমানো হবে। সিদ্ধান্তটি আগামী মাস থেকে কার্যকর হবে এবং চলবে বছরের শেষ নাগাদ।

আইসিই ফিউচারসে গতকাল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্ট ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৭ ডলারে লেনদেন হয়েছে। অন্যদিকে নিউইয়র্ক মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জে মার্কিন বাজার আদর্শ ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট লেনদেন হয়েছে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৩ ডলারে। উভয় বাজার আদর্শের দাম এক মাসের ব্যবধানে ২ শতাংশ বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির সর্বশেষ তথ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার বাড়ানোর গতি শ্লথ হওয়ার সম্ভাবনায় দাম বেড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে সংকোচনের পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম চীনে চাহিদা বৃদ্ধি। দেশটি জিরো কভিড নীতি থেকে সরে আসায় অর্থনীতি চাঙ্গা হচ্ছে, গতিশীল হচ্ছে শিপ্লোৎপাদন। ফলে সেখানে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।

এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে বড় রদবলদ পরিলক্ষিত হয়েছে। ইউক্রেনে সামরিক আগ্রাসনের অজুহাত দেখিয়ে রাশিয়ার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে পশ্চিমা দেশগুলো। দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে দেয়াই এর উদ্দেশ্য। এক্ষেত্রে পশ্চিমাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল রুশ জ্বালানি ও আর্থিক খাত।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এরই মধ্যে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তার ওপর জি ৭ভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে রুশ জ্বালানি তেলের ওপর প্রাইস ক্যাপ আরোপ করেছে। 

পাল্টা জবাব দিয়েছে রাশিয়াও। যেসব দেশ প্রাইস ক্যাপ চুক্তিতে অংশ নিয়েছে, সেসব দেশে অধ্যাদেশ জারি করে জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে। এছাড়া ইউরোপে মোটাদাগে জ্বালানি পণ্য বিক্রি কমিয়ে দিয়েছে মস্কো। 

বিপরীতে এশিয়া, বিশেষ করে চীন ও ভারতে জ্বালানি তেল বিক্রি ব্যাপক হারে বাড়িয়েছে রাশিয়া। এসব দেশকে দেয়া হচ্ছে আকর্ষণীয় মূল্যছাড়ের সুবিধা। এ পরিস্থিতিতে ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশগুলোকে বিকল্প বাজার থেকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করছে। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেশি দামে জ্বালানিটি বিক্রি করছে বিভিন্ন উত্তোলক দেশ।

রাশিয়া থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় গত শীতে বড় ধরনের সংকটে পড়ার আশঙ্কায় ছিল ইউরোপ। কিন্তু শীতের তীব্রতা কম থাকায় সে সংকট তৈরি হয়নি। তবে আগামী শীতে এ অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন ফাতিহ বিরোল।