যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। আয়ের বড় অংশই চলে যাচ্ছে খাবার ও বাসস্থানের পেছনে। ফলে শিক্ষা, বিনোদনসহ জীবনযাত্রার অন্যান্য খাতে ব্যয়ের সুযোগ কমছে। দেশটির শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএলএস) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত বছর মার্কিন ভোক্তাদের মোট ব্যয়ের ৪৬ দশমিক ৯ শতাংশ গেছে খাদ্য ও বাসস্থানের পেছনে। ১৫ বছরের মধ্যে এ হার সর্বোচ্চ। খবর ফরচুন।

বিএলএসের বার্ষিক ভোক্তা ব্যয় প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় বাসস্থান খাতে ব্যয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। খাদ্য খাতে বেড়েছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার পেছনে মানুষের ব্যয়ও এখন ঊর্ধ্বমুখী। অন্যদিকে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি ছিল ২ দশমিক ৬ শতাংশ।

বাসস্থান খাতে ব্যয় বৃদ্ধির চাপ দেখা গেছে সবচেয়ে বেশি। খাতটিতে ২০২৫ সালে একটি মার্কিন পরিবারের গড় বার্ষিক ব্যয় দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৭৯০ ডলারে। ২০২৪ সালে এ পরিমাণ ছিল ২৬ হাজার ২৬৬ ডলার। বাসস্থান খাতের মধ্যে বাড়ি ভাড়া, বাড়ির মালিকানাসংক্রান্ত ব্যয়, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির বিল, আসবাব ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অন্তর্ভুক্ত।

দেশটিতে ভাড়া বাসায় থাকার খরচও বেড়েছে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া নিজের বাড়িতে বসবাসের ব্যয় বেড়েছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। সব মিলিয়ে গত বছর বাসস্থানের জন্য গড় ব্যয় বেড়েছে ৮ শতাংশ।

খাদ্য খাতেও খরচ ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৫ সালে একজন মার্কিন ভোক্তার খাবার বাবদ গড় বার্ষিক ব্যয় ছিল ১০ হাজার ৬৩৩ ডলার। আগের বছর এ পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ১৬৯ ডলার। দেশটিতে মাংস, মুরগি, মাছ ও ডিম কেনার ব্যয় বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। এ খাতে ব্যয় বৃদ্ধির হার ছিল ১১ দশমিক ৭ শতাংশ।

খাবার ও বাসস্থানের পাশাপাশি চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতেও ব্যয় বেড়েছে। ২০২৫ সালে চিকিৎসা খাতে গড় বার্ষিক ব্যয় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ৬ হাজার ৪৭০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের বছর এ পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ১৯৭ ডলার। এর বড় অংশ গেছে স্বাস্থ্য বীমার প্রিমিয়াম পরিশোধে। স্বাস্থ্য বীমার পেছনে গড় ব্যয় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৩১০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে মার্কিন ভোক্তাদের মনোভাবেও। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোক্তা আস্থা সূচকে এর প্রতিফলন দেখা গেছে। চলতি বছরের অক্টোবরে এ সূচক দাঁড়িয়েছে ৪৮ পয়েন্টে, যা সেপ্টেম্বরে ছিল ৪৮ দশমিক ১। অন্যদিকে গত বছরের অক্টোবরে সূচকটির অবস্থান ছিল ৫৩ দশমিক ৬ পয়েন্ট। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ভোক্তা আস্থা কমেছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ।

শুধু ভোক্তা আস্থাই নয়, সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। আরবান ইনস্টিটিউটের অক্টোবরের এক পর্যালোচনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৯ শতাংশ পরিবারের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই। ফলে এসব পরিবারের পক্ষে নিজেদের এলাকায় নিরাপদ ও স্থিতিশীল জীবনযাপন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাসস্থান ও শিশুদের দেখাশোনার খরচও পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। আরবান ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালের তুলনায় এখন ভাড়াটিয়াদের মাসিক বাড়ি ভাড়া গড়ে ৭১০ ডলার বেশি। অন্যদিকে দুটি ছোট সন্তান রয়েছে এমন পরিবারগুলোর শিশু পরিচর্যার বার্ষিক ব্যয় এক দশক আগের তুলনায় বেড়েছে ৬ হাজার ৬০০ ডলার।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপেও আর্থিক চাপের চিত্র উঠে এসেছে। গত জুলাই ও আগস্টে পরিচালিত এ জরিপে অংশ নেয়া ৪৪ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক জানান, চিকিৎসা, যাতায়াত, বাড়ি ভাড়া বা বন্ধকি ঋণের কিস্তি ও খাবারের ব্যয় মেটাতে গিয়ে তারা অন্তত একবার আর্থিক সংকটে পড়েছেন। নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এ হার ৭১ শতাংশ।