জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক কাঠামোর পরিবর্তনে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে যাচ্ছে। ২০৪৫ সালে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছার পর তা কমতে শুরু করবে। একই সঙ্গে বাড়বে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যয়। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখনই কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির ২০২৬ সালের ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল এক অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২০৩৪ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছবে। তবে বাংলাদেশ এ অঞ্চলের গড় সময়ের তুলনায় ১০ বছর বেশি পাবে। ২০৪৫ সালে দেশের ১৫-৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছার পর তা কমতে থাকবে। অন্যদিকে বাড়বে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা। ২০৫১ সালের মধ্যে দেশের মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বয়স হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি। তখন বাংলাদেশ বার্ধক্য সমাজে পরিণত হবে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মালদ্বীপ, ভুটান ও শ্রীলংকা এর আগেই এ অবস্থানে পৌঁছবে। কর্মক্ষম সমাজ থেকে বার্ধক্য সমাজে রূপান্তরে বাংলাদেশের সময় লাগবে ২৪ বছর। আর ভারত ও নেপালের ক্ষেত্রে যথাক্রমে ২৫ ও ৩০ বছর।

বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো তুলনামূলক কম মাথাপিছু আয় নিয়েই দেশটি বার্ধক্য সমাজে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। অতীতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত বাড়ায় মাথাপিছু প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক অবদান এসেছে। বেশি মানুষ কর্মে নিয়োজিত থাকায় উৎপাদন ও আয় বেড়েছে। কিন্তু ২০৪৫ সালের পর এ অবদান কমতে কমতে নেতিবাচক হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের সমৃদ্ধি নির্ভর করবে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা, মানবসম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর। প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে প্রতিটি কর্মীর দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি কাজের সুযোগ সম্প্রসারণ জরুরি হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানোর পথে বড় বাধা অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে। এতে নিয়োজিত রয়েছে প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ। স্নাতক বা তার চেয়ে বেশি শিক্ষিতদের ৬০ শতাংশের বেশি যোগ্যতা অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক চাকরি না পেয়ে অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এসব কাজে তাদের আয় আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের তুলনায় ৪৫-৮৪ শতাংশ কম। মাঝারি ও বড় প্রতিষ্ঠানেও মোট কর্মসংস্থানের ৩৫-৪০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক।

প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রাঞ্জিসকা ওনসর্জ বলেন, ‘কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি থাকলেই তা অর্থনৈতিক সুবিধায় পরিণত হয় না; এ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে যুক্ত করতে হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় এক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে এ অঞ্চলে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬০ শতাংশ কর্মসংস্থানে নিয়োজিত। অন্য উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে এ হার ৬৯ শতাংশ। অকৃষি খাতে এ ব্যবধান আরো বেশি। নারীদের কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণের হার কম হওয়াও এর অন্যতম কারণ।’

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। স্নাতক ডিগ্রিধারীদের ৪৪ শতাংশের কোনো আনুষ্ঠানিক চাকরি নেই। জনমিতিক লভ্যাংশের সময় শেষ হলে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যয়ও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশে সরকারি খাতে বাধ্যতামূলক পেনশন ব্যবস্থা থাকলেও বেসরকারিতে তা নেই। ২০২৩ সালে চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশন স্কিম স্বেচ্ছামূলক হওয়ায় বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এটিকে বাধ্যতামূলক পেনশন কভারেজের আওতায় দেখানো হয়নি।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, ‘বাংলাদেশের জনমিতিক সুযোগ নির্ভর করছে দেশটি এখন কী পদক্ষেপ নেয় তার ওপর। উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণদের বাজারসংশ্লিষ্ট দক্ষতায় প্রস্তুত করা এবং নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের বাধা দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা ও বার্ধক্যকালীন আয়নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। এ চাহিদা পূরণে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণও জোরদার করতে হবে।’

প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘জনমিতিক লভ্যাংশের কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার শিক্ষা খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পরিচর্যা ও সহায়তায় তাদের পিতা-মাতাদেরও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে।’

অন্যদিকে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, ‘সরকার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র গড়তে “‍জীবনচক্রভিত্তিক সুরক্ষা কৌশল” গ্রহণ করেছে। এতে নবজাতকের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি থেকে প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা ও সম্মানকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।’

প্যানেল আলোচনায় আরো অংশ নেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ এবং বিশ্বব্যাংকের রিজিওনাল প্র্যাকটিস ডিরেক্টর জেম মেতে। সঞ্চালনায় ছিলেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যাঁ পেসমে। এর আগে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফ্রান্সিসকা লিজেলোটে ওনসর্গ।