মহামারীর আগে থেকেই বাড়ছে বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ। কভিডের বিধ্বস্ত অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঋণ গ্রহণ আরো বাড়িয়ে দেয়। তবে বর্তমানে এ পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার ঝুঁকি ও ক্রমবর্ধমান সুদের হার এ প্রবণতাকে উল্টে দিয়েছে। ফলে নিম্নমুখী হয়েছে বৈশ্বিক ঋণের চাপ। তবে ঋণের পরিমাণ কমলেও উদীয়মান অর্থনীতিগুলোয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বিপরীতে ঋণের অনুপাত আবারো রেকর্ড উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। খবর দ্য ন্যাশনাল।
সম্প্রতি প্রকাশিত ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সরকার ও অ-আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণের পরিমাণ ২৯০ লাখ কোটি (ট্রিলিয়ন) ডলারে নেমেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিক শেষেও ঋণের পরিমাণ ৩০০ লাখ কোটি ডলার ছিল। ২০১৮ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের পর এপ্রিল-জুন সময়ে প্রথম বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ নিম্নমুখী হয়েছিল। যদিও এক্ষেত্রে মুদ্রার বিনিময় হার অবদান রেখেছে।
গ্লোবাল ডেবট মনিটর শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৃতীয় প্রান্তিকে বৈশ্বিক ঋণের অনুপাত জিডিপির ৩৪৩ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে উদীয়মান বাজারগুলোয় এ প্রবণতা উল্টো দেখা গিয়েছে। বাজেট ঘাটতি ও ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোয় জিডিপির বিপরীতে ঋণের অনুপাত ২৫৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এ অনুপাত ২০২১ সালের প্রথম প্রান্তিকের রেকর্ডের সমান। যদিও বর্তমানে বৈশ্বিক এ অনুপাত ২০২১ সালের প্রথম প্রান্তিকের রেকর্ড উচ্চতায় থেকে ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট কম।
এদিকে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং উচ্চ সুদের হারের কারণে জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বিশ্বের ঋণের স্তূপ ৬ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার কমে ২৯০ লাখ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোয়ও ঋণের পরিমাণ ৯৬ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলারে নেমেছে। যেখানে আগের প্রান্তিকে দেশগুলোর ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৮ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার।
আইআইএফের টেকসই গবেষণা বিভাগের পরিচালক এমরে টিফটিক প্রতিবেদনে লিখেছেন, সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে অর্থায়নের পরিস্থিতি কঠোর হচ্ছে। এতে চলতি বছর উচ্চ ঋণগ্রহীতাদের জন্য পরিস্থিতি আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাপী সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের ঋণেও সুদের হার দ্রুত বাড়বে। বিশেষ করে সাব-সাহারান আফ্রিকা ও ইউরোপের উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে।
নীতিনির্ধারক ও রেটিং এজেন্সিগুলো সতর্ক করেছে, ঋণের চাপ থেকে ভঙ্গুর উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো এখনো মুক্ত হয়নি। দেশগুলোর ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আইআইএফ জানিয়েছে, ঋণের উচ্চ খরচ বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা করা দেশগুলোকে সবচেয়ে বেশি বিপদে ফেলে দিতে পারে। এজন্য সম্প্রতি মিসরে অনুষ্ঠিত কপ২৭ জলবায়ু সম্মেলনে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’
নামে একটি তহবিল গঠন করতে সম্মত হয়েছে দেশগুলো। এ চুক্তি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়েছে। এ তহবিলের মাধ্যমে জলবায়ু বিপর্যয়ের প্রভাব মোকাবেলায় দরিদ্র দেশগুলোকে সহায়তা দেয়া হবে।
আইআইএফ জানিয়েছে, গত বছরগুলোয় ডলার-ঋণ নির্ভরতা হ্রাস সত্ত্বেও এটি লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকায় উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গিয়েছে। অনেক দেশকে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ব্যাপক পরিবর্তনের সম্মুখীন হতে হয়েছে। ঋণের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিম্ন আয়ের পরিবার ও ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি ঋণে উচ্চ নির্ভরতার কারণে তারা বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। তৃতীয় প্রান্তিকে অন্য মুদ্রার বিপরীতের ডলারের বিনিময় হার ২০ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে ডলারের বিপরীতে উন্নয়নশীর দেশগুলোর মুদ্রার বিনিময় হার ১০ শতাংশের মতো কমেছে।










