ক্রমবর্ধমান রয়েছে মূল্যস্ফীতি। বাড়ছে শ্রম সংকট। এ অবস্থায় কর্মীদের বেতন বাড়াতে চাপে পড়েছে এশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে নতুন বছরে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি দেখতে যাচ্ছেন এ অঞ্চলের শ্রমজীবীরা। ভারত থেকে ভিয়েতনাম পর্যন্ত নিয়োগকর্তারা নতুন কর্মী আকৃষ্ট এবং পুরনো কর্মী ধরে রাখতে বেতন প্যাকেজ বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। প্রত্যাশিত বেতন বৃদ্ধি ২০২৩ সালের মূল্যস্ফীতির হারকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। এটি চলতি বছর জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার পর এশীয়দের প্রকৃত আয় বাড়া নিয়ে আশা জাগিয়েছে। নতুন এক সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

জাপানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী বছর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ইন্দোনেশিয়ায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৫ দশমিক ১, ফিলিপাইনে ৬, সিঙ্গাপুরে ৪ দশমিক ৭, থাইল্যান্ডে ৫ দশমিক ১ ও ভিয়েতনামে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ বেতন বাড়ানোর পূর্বাভাস দিয়েছে। নিউইয়র্ক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানি অ্যাওনের জরিপে উঠে এসেছে, মালয়েশিয়া ছাড়া সব দেশের প্রত্যাশিত বেতন বৃদ্ধি ২০২২ সালের হারকে ছাড়িয়ে গেছে। কেবল মালয়েশিয়ায় বেতন বৃদ্ধির পূর্বাভাস ২০২২ সালের পর্যায়ে রয়ে গেছে।

অ্যাওন আশিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সাত শতাধিক প্রতিষ্ঠানের বেতন বৃদ্ধি ও টার্নওভার নিয়ে জরিপ পরিচালনা করেছে। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এশীয় ব্লকে কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি শ্রমবাজারের চাহিদা এবং কর্মীর সহজলভ্যতার মতো বিষয়গুলোও এক্ষেত্রে অবদান রাখে। কর্মীদের চাকরি পরিবর্তনের উচ্চ প্রবণতা নিয়োগকর্তাদের ওপর চাপ তৈরি করেছে। ফলে নতুন কর্মী নেয়া এবং পুরনো কর্মী ধরে রাখার ক্ষেত্রে তারা বেতন বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।

অ্যাওনের দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের হিউম্যান ক্যাপিটাল সলিউশন বিভাগের প্রধান রাহুল চাওলা বলেন, কোম্পানিগুলোকে অবশ্যই বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদিও ব্যবসার জন্য কর্মীদের ধরন এবং কাজের প্রকৃতি অনুযায়ী বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

গত মাসে প্রকাশিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মার্সারের একটি সমীক্ষার ফলাফলেও ২০২৩ সালে বেতন বৃদ্ধির লক্ষণ পাওয়া গেছে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলজুড়ে কোম্পানিগুলো গড়ে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। এ হার ২০২২ সালের গড় ৪ দশমিক ৬ শতাংশের চেয়ে কিছুটা বেশি।

মার্সারের সমীক্ষায় দেশভেদে বেতন বৃদ্ধির পার্থক্যের বিষয়টিও উঠে এসেছে। আগামী বছর ভারতে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। যেখানে জাপান ছিল সর্বনিম্ন ২ দশমিক ২ শতাংশ। যদিও উভয় পরিসংখ্যানই চলতি বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি ছিল। চলতি বছর ভারতে গড়ে বেতন বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ৭৯ ও জাপানে ২ দশমিক ১৪ শতাংশ।

এদিকে এশিয়ায় একমাত্র দেশ হিসেবে চীনের মূল ভূখণ্ডে নতুন বছরে বেতন বৃদ্ধির হার ২০২২ সালের তুলনায় কম হতে পারে। চলতি বছরে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ বেতন বাড়লেও আগামী বছর ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেতন বাড়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়ায় দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলোও চাপে পড়েছে।

মার্সারের সমীক্ষায় উঠে এসেছে, আগামী বছর হংকংয়ে ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ বেতন বাড়তে পারে। চলতি বছর এ হার ছিল ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ অঞ্চলে বেতন বৃদ্ধির প্রত্যাশা মূল্যস্ফীতির হারের পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে। যেমন আগামী বছর ভারতে ৫ দশমিক ১ শতাংশ, জাপানে ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং চীনের মূল ভূখণ্ডে ২ দশমিক ২ শতাংশ ও হংকংয়ে ২ দশমিক ৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। বেতন বৃদ্ধির এ পূর্বাভাস ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন কর্মীদের জন্য স্বস্তির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তবে অনেকে হয়তো আরো বেশি বেতন বৃদ্ধির সুযোগ খুঁজছেন।

গত মাসে প্রকাশিত নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান রবার্ট ওয়াল্টার্সের গ্লোবাল স্যালারি সার্ভেতে উঠে এসেছে, অনেক কর্মী ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি চান। এছাড়া বিশেষ প্রযুক্তিগত দক্ষ ব্যক্তিরা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির প্রত্যাশা করছেন। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সিঙ্গাপুরের ৮০ শতাংশ কর্মী আরো বেশি বেতনের প্রত্যাশা করছেন। অন্যদিকে দেশটির ৭১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান পরবর্তী ১২ মাসের বেতন বৃদ্ধি বা বোনাস মূল্যায়নের ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়ার কথা জানিয়েছে।