গমের বৈশ্বিক চাহিদার এক-তৃতীয়াংশই সরবরাহ করে রাশিয়া ও ইউক্রেন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশ দুটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে শস্যটির সরবরাহ মারাত্মক সংকটের মুখে পড়ে। যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহে ফিউচার মার্কেটে এটির দাম প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়ে যায়। তবে দ্রুতই গমের বৈশ্বিক বাজার যুদ্ধের এ প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় ও টেক্সাস টেক ইউনিভার্সিটির গবেষকরা এ গবেষণা পরিচালনা করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, গমের বৈশ্বিক দাম এবং বাজার পরিস্থিতিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই শিথিল হয়ে এসেছে।

কৃষ্ণ সাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে বিশ্ববাজারে গমের দাম আকাশচুম্বী হয়ে পড়েছিল। তবে কয়েক মাস পরই দাম কমতে শুরু করে। কারণ হিসেবে গবেষকরা জানান, যুদ্ধের প্রভাবে ইউক্রেনের গম উৎপাদন ও রফতানিতে ধস নামলেও তাতে ভারসাম্য এনেছে অন্য উৎপাদক দেশগুলো। ফলে ইউক্রেন থেকে সৃষ্ট সরবরাহ সংকট অনেকটাই পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছে।

ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের কৃষি ও ভোক্তা অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উইলিয়াম রিডলে বলেন, ‘‌অনেকের মতো আমারও ধারণা ছিল যুদ্ধ শুরুর পরবর্তী সপ্তাহগুলোয় গমের দাম যে হারে বেড়েছিল, সেটির ধারা আগামী বেশ কয়েক বছর অব্যাহত থাকবে। কিন্তু যখন বোঝা গেল অন্য রফতানিকারক দেশগুলো সরবরাহে সৃষ্ট ঘাটতি পূরণে সক্ষম, তখন থেকেই দাম কমতে শুরু করে।’

তিনি আরো জানান, গমের দাম ভবিষ্যতে আরো বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনায় যুদ্ধ শুরুর পরের কয়েক সপ্তাহে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আগ্রাসী ক্রয়প্রবণতা দেখা দেয়। বেচাকেনার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ওই সময় ২৭ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল গমের দাম। তবে এ সংঘাতের শুরু থেকে গত মাস পর্যন্ত দাম বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। 

ওয়ার্ল্ড গ্রেইন ডটকমকে উইলিয়াম রিডলে বলেন, ‘‌আমাদের গবেষণায় প্রধানত যে বিষয়টি উঠে এসেছে তা হলো গমের দাম ও প্রাপ্যতায় প্রভাব পড়েছে ঠিকই। তবে পরিস্থিতি যত বেশি খারাপের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, ততটা খারাপ হয়নি। যখন আপনি ইউক্রেনের গম বাজার থেকে সরিয়ে নেবেন, তখন সে জায়গাটা অন্য সরবরাহকারীরা দখল করে নেবে, আর সেটাই ঘটেছে। সরবরাহ ধারা ঠিক রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো রফতানিকারক দেশগুলো।’

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ সামরিক বাহিনীর হামলার পর পরই গম রফতানিতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে ইউক্রেন। দেশটির কৃষ্ণ সাগরীয় সব বন্দর অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। টানা পাঁচ মাস ধরে এসব বন্দর দিয়ে গমসহ অন্যান্য পণ্য রফতানি বন্ধ ছিল। এরপর রাশিয়া দেশটির সঙ্গে একটি চুক্তি করতে সম্মত হয়। এর আওতায় ইউক্রেনকে কৃষ্ণ সাগরীয় বন্দর ব্যবহার করে রফতানির অনুমতি দেয়া হয়। এ চুক্তিতে মধ্যস্থতা করে জাতিসংঘ ও তুরস্ক। চুক্তিটি এক বছর পর্যন্ত বহাল ছিল। গত বছরের জুলাইয়ে রাশিয়া এ চুক্তি থেকে বের হয়ে আসে এবং ইউক্রেনের কৃষ্ণ সাগরীয় বন্দরের খাদ্যশস্য অবকাঠামোগুলোয় হামলা চালাতে শুরু করে।

এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেন কৃষ্ণ সাগরে আরেকটি নতুন রফতানি করিডোর চালু করে। এর মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলোর জলপথ ব্যবহার করে বসফরাস প্রণালি দিয়ে শস্য রফতানি করছে দেশটি। অন্যদিকে ইউক্রেনে প্রবেশের ক্ষেত্রে দেশটির জাহাজগুলো দানিয়ুব নদীর পাশ দিয়ে রোমানিয়ান জলপথ ব্যবহার করছে।

মার্কিন কৃষি বিভাগের দেয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ বিপণন মৌসুমে (জুলাই-জুন) ইউক্রেনের ভুট্টা রফতানি ৮ শতাংশ বেড়ে ২ কোটি ৯২ লাখ টনে উন্নীত হতে পারে। গম রফতানির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১ কোটি ৭৭ লাখ টনে, যা আগের মৌসুমের তুলনায় ৩ শতাংশ বেশি। যব রফতানি বাড়তে পারে ২২ শতাংশ। রফতানির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৩৩ লাখ টনে।