পরিবেশের কথা বিবেচনায় নিয়ে বাড়ছে বিদ্যুচ্চালিত যানবাহনে (ইভি) বিনিয়োগ। সম্প্রসারণ হচ্ছে ইভির বাজার। এ শিল্পসংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ ঘিরে আগ্রহী হয়ে উঠেছে বিভিন্ন দেশ। নিজ ভূখণ্ডে বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় মনোযোগী হয়ে উঠেছে সরকারগুলো। এশিয়ায় ইভির পাওয়ার হাউজে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে ইন্দোনেশিয়া।
দ্য ন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইভি ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহৃত নিকেলের বৃহত্তম মজুদ রয়েছে দেশটিতে। তাই ইভি তৈরির শীর্ষ প্রতিষ্ঠান টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলোন মাস্কের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী ইন্দোনেশিয়ার নীতিনির্ধারকরা।
ইভি উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র হওয়ার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ইন্দোনেশিয়াকে অতীতের পরিবেশগত ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কয়েক দশক ধরে অনিয়ন্ত্রিত খনন কার্যক্রমের ফলে দেশটির প্রধান ধাতু উত্তোলনকারী দ্বীপগুলো অনেকাংশেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যদিও তিন বছরে জাকার্তা ব্যাটারি ও ইভি উৎপাদন বাবদ প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করে। তবে আরো বেশি বিনিয়োগ আনার লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন প্রেসিডেন্ট জোকো উইডোডো। গত সপ্তাহে দক্ষিণ সুলাওয়েসি প্রদেশের সোরোওয়াকোর নিকেল খনি পরিদর্শন করেছেন তিনি। ব্যক্তিগতভাবে টেসলার নির্বাহী মাস্ককে এ খাতে বিনিয়োগের জন্য রাজি করার চেষ্টা করেছেন বলে ব্লুমবার্গের বরাত দিয়ে জানিয়েছে ন্যাশনাল নিউজ।
বিনিয়োগকারীরা সবসময় তাদের সুনাম রক্ষার বিষয়কে গুরুত্ব দেয় ও পরিবেশগত ইস্যুগুলো বিবেচনায় সতর্ক থাকে। তাই কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য পরিবেশগত ও আইনি সুরক্ষার প্রশ্নগুলোর সমাধান করতে হবে জোকো উইডোডোকে।
এ নিয়ে ডাবলিন সিটি ইউনিভার্সিটির পরিবেশগত রাজনীতি ও নীতির সহকারী অধ্যাপক ড্যানি মার্কস বলেন, ‘ধাতু উত্তোলনের কার্যক্রমগুলো এখনো পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।’ তিনি সুমাত্রা দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে বাংকা-বেলিটুং দ্বীপপুঞ্জে কয়েক দশক ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ধাতু উত্তোলনের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, ‘এটি বন ও প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস করেছে।’ তাই ইন্দোনেশিয়াকে এর ধাতু উত্তোলন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
খনির দুর্ঘটনার কারণে অসংখ্য শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে দেশটিতে। সঙ্গে রয়েছে শিশুশ্রমের প্রশ্নও। আর ইভি কোম্পানিগুলো কখনই চাইবে না যে তাদের সাপ্লাই চেইনগুলো কলঙ্কিত হোক। তাই ইন্দোনেশিয়ার সরকারকে অবিলম্বে পরিবেশগত সুরক্ষাগুলোকে জোরদার করতে হবে, যাতে নিকেল খনির ক্ষেত্রে অনুরূপ সমস্যা না হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রোধের চাবিকাঠি হিসেবে পুনর্বিকিরণযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বিশ্বব্যাপী ইভি উৎপাদন ও বিক্রয় বাড়াচ্ছে। কিন্তু কনসালট্যান্সি ফার্ম ম্যাককিনসে অ্যান্ড কোম্পানির মতে, ২০২২ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইভির বিক্রির পরিমাণ ছিল ২ শতাংশেরও কম। তাই সরকারগুলো ইভি উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হতে অটো ও ব্যাটারি নির্মাতাদের জন্য প্রণোদনা, ক্রেতাদের জন্য কর অবকাশসহ উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। সিঙ্গাপুরের ম্যাককিন্সির সহযোগী অংশীদার রাহুল গুপ্ত বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়া ব্যাটারি উৎপাদন ও ইভি অ্যাসেম্বলিতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড ইভি অ্যাসেম্বলি এবং যন্ত্রাংশ ব্যবসায় অগ্রগতি অর্জন করেছে।’
নিকেল ছাড়াও ইন্দোনেশিয়ায় কোবাল্ট ও তামাসহ ইভি ব্যাটারির জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের মজুদ রয়েছে। তবে ব্যাটারিতে ব্যবহারযোগ্য নিকেল তৈরিতে ইন্দোনেশিয়াকে টেসলার পছন্দগুলোয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। ইভি তৈরির লক্ষ্যগুলোকে অর্জন করতে কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আশার কথা, গত বছর দেশটি কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সরে আসার জন্য দাতাদের সাহায্যে সবচেয়ে বড় জলবায়ু আর্থিক চুক্তি সম্পন্ন করে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সেই প্রচেষ্টাগুলোকেও ত্বরান্বিত করতে হবে।
এখনো ইন্দোনেশিয়ান কিছু নিকেল খনিতে অনুমতি ছাড়াই কার্যক্রম চলছে, যা সংরক্ষিত এলাকায় বন উজাড়, মাটি ও সমুদ্র দূষণ এবং স্থানীয় জেলেদের জীবিকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই সরকারকে খনির ওপর নজরদারি জোরদার করতে হবে।










