শ্রীলংকার চা শিল্পের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। দেশটি বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ চা রফতানিকারক ও চতুর্থ শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশ। তবে গত বছর থেকে দেশটির চা শিল্পে মন্দা ভাব বজায় রয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ায় পানীয় পণ্যটির উৎপাদন যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে রফতানিও। এ পরিস্থিতির মধ্যে দেশটির চা শিল্পের জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে নভেল করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারী। প্রাণঘাতী ভাইরাসটির বিস্তার রোধে বিশ্বজুড়ে নেয়া ব্যবস্থাগুলো বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর জের ধরে শ্রীলংকার চা শিল্পে ঘটে গেছে অভূতপূর্ব ঘটনা। চলতি বছরের মার্চে দেশটি থেকে পানীয় পণ্যটির রফতানি কমে এ যাবত্কালের সর্বনিম্নে ঠেকেছে।

কলম্বোভিত্তিক ফোর্বস অ্যান্ড ওয়াকার টি ব্রোকারসের উদ্ধৃতি দিয়ে ডেইলি ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, গত মার্চে শ্রীলংকা থেকে সব মিলিয়ে ১ কোটি ৩৮ লাখ ২৭ হাজার ৯২৫ কেজি চা আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা অর্ধেকের কম। এছাড়া এটি দেশটির ইতিহাসে চায়ের মাসভিত্তিক রফতানির সর্বনিম্ন রেকর্ড। এর আগে ২০০৯ সালের এপ্রিলে দেশটি মোট ১ লাখ ৪০ হাজার টন চা রফতানি করেছিল, যা ছিল গত মার্চের আগে শ্রীলংকার সর্বনিম্ন চা রফতানির রেকর্ড।

২০১৯ সালের মার্চে শ্রীলংকা রফতানি করেছিল মোট ২ কোটি ৬৪ লাখ ৮ হাজার ২৩৮ কেজি চা। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে দেশটি থেকে পানীয় পণ্যটির রফতানি ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। পরিমাণের হিসাবে যা ১ কোটি ২৬ লাখ কেজির বেশি।

ফোর্বস অ্যান্ড ওয়াকার টি ব্রোকারসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে গত ২০ মার্চ দেশজুড়ে কারফিউ জারি করে শ্রীলংকা সরকার। এতে মার্চের শেষ দিকে এসে দেশটির চা বাগানগুলোর উৎপাদন ও বিপণনসহ যাবতীয় কার্যক্রম ব্যাহত হয়। মূলত এ কারণেই গত মাসে দেশটি থেকে পানীয় পণ্যটির রফতানি এতটা কমে গেছে।

শ্রীলংকা থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রধানত প্যাকেটজাত, টি ব্যাগ ও বাল্ক টি—এ তিন ধরনের চা রফতানি হয়। মার্চে দেশটির সব ধরনের চা রফতানিতে নিম্নমুখী প্রবণতা বজায় ছিল। গত মার্চে দেশটি মোট ৫৭ লাখ ১ হাজার ৪৬৪ কেজি বাল্ক টি রফতানি করেছে। প্যাকেটজাত চা রফতানি করেছে ৬৩ লাখ ২০ হাজার ৬৯৪ কেজি। টি ব্যাগ রফতানি করেছে ১৩ লাখ ২৭ হাজার ৬১৫ কেজি। ইনস্ট্যান্ট টি রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৮ হাজার ৪৫২ কেজিতে। এ সময় দেশটি থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রিন টি রফতানি হয়েছে ৩ লাখ ৯ হাজার ৭০০ কেজি। এ সময়ে বাল্ক ও প্যাকেট টিয়ের রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অর্ধেকের বেশি কমে গেছে।

এদিকে রফতানি কমার সঙ্গে সঙ্গে এ খাতে দেশটির আয়ও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। গত মার্চে পানীয় পণ্যটির রফতানি থেকে দেশটি মোট ১৫০ কোটি শ্রীলংকান রুপি (স্থানীয় মুদ্রা) আয় করেছে। ২০১৯ সালের একই মাসের তুলনায় যা ৪৮ শতাংশ কম।

শ্রীলংকার চা শিল্প চলতি বছর শুরুতেই ভর করেছিল মন্দা ভাবে। এর ওপর মার্চের এমন পতন বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশটি থেকে পণ্যটির সম্মিলিত রফতানি কমিয়ে দিয়েছে। ফোর্বস অ্যান্ড ওয়াকার টি ব্রোকারসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশটি মোট ৫ কোটি ৯৫ লাখ কেজি চা আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি করেছে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ১ কোটি ৪১ লাখ কেজি কম। এ সময় দেশটি পণ্যটির রফতানি থেকে মোট ৪ হাজার ৯২০ কোটি শ্রীলংকান রুপি আয় করেছে। ২০১৯ সালের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় এ খাতে দেশটির আয় কমেছে ১ হাজার ৩২০ কোটি শ্রীলংকান রুপি।

চলতি বছরের শুরু থেকে চায়ের বৈশ্বিক চাহিদা কমেছে। কভিড-১৯-এর প্রকোপে বৈশ্বিক অর্থনীতির শ্লথগতি এক্ষেত্রে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির দাম কমে গেছে। একদিকে রফতানি চাহিদা হ্রাস, অন্যদিতে মূল্য হ্রাস—সব মিলিয়ে শ্রীলংকার চা খাতের আয় রেকর্ড কমেছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ফ্রি অন বোর্ড চুক্তিতে প্রতি কেজি শ্রীলংকার চায়ের গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮২৬ দশমিক ৩৯ রুপি, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গড় মূল্যের তুলনায় যা ২১ দশমিক ১৮ রুপি কম।

শ্রীলংকা থেকে রফতানি হওয়া চায়ের প্রধান ক্রেতা ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। দেশটির বিখ্যাত সিলোন টির শীর্ষ রফতানি বাজার চীন। এর বাইরে রাশিয়া, তুরস্ক, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্যটি রফতানি করে দেশটি। গত মাসে বেশির ভাগ দেশেই পণ্যটির রফতানি কমেছে। এ সময় শ্রীলংকা থেকে পণ্যটির শীর্ষ গন্তব্য ছিল ইরাক। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে তুরস্ক ও রাশিয়া। এছাড়া ৩৯ লাখ কেজি চা আমদানি করে চতুর্থ শীর্ষস্থানে রয়েছে ইরান। এরপর রয়েছে যথাক্রমে আজারবাইজান, চিলি, সৌদি আরব, চীন ও সিরিয়া।

এ সময় ইউক্রেনে দেশটি থেকে চায়ের রফতানিতে প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে ফোর্বস অ্যান্ড ওয়াকার টি ব্রোকারস। তবে জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জার্মানিতে পণ্যটির রফতানি ২০১৯ সালের মার্চের তুলনায় ব্যাপক হারে কমেছে।

 ডেইলি ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও দ্য সেন্টিনেল নিউজ অবলম্বনে