তবে এসবের পুরোটাই হয়েছে খাতভিত্তিক। দেশে কোনো সমন্বিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। ফলে এসব অবকাঠামোর কার্যকর সুবিধা নিতে পারেনি বাংলাদেশ। এতে ব্যাহত হয়েছে রফতানি কার্যক্রমও। তাই দেশকে এগিয়ে নিতে হলে লজিস্টিক খাতের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা দূর করা ছাড়া বিকল্প নেই।
রাজধানীর মতিঝিলে গতকাল এক গোলটেবিল আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা। ‘বাণিজ্যনির্ভর বাংলাদেশের জন্য সমন্বিত বন্দর এবং লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক এ সভার আয়োজন করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ বলেন, ‘সমন্বিত বন্দর ও লজিস্টিকস খাতে দক্ষ ব্যবস্থাপনায় আমরা বেশ পিছিয়ে রয়েছি, যা ব্যবসা পরিচালনায় ক্রমাগত ব্যয় বাড়াচ্ছে। এ খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ করা দরকার।’
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ড. এম মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, ‘গত চার দশকে বাংলাদেশের রফতানিতে আমূল ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও তা মূলত গুটিকয়েক পণ্য ও বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। দেশে ব্যবসা পরিচালনার অন্যতম বাধা দুর্বল লজিস্টিকস কাঠামো।’
ড. মাসরুর রিয়াজ বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ তুলে ধরে জানান, ব্যবসা খাতে লজিস্টিক ব্যয় ২৫ শতাংশ কমানো গেলে রফতানি প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে আরো ২০ শতাংশ। পরিবহন ব্যয় ১ শতাংশ কমলে পোশাক খাতের রফতানি বাড়বে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ, বন্দরে অপেক্ষমাণ সময় একদিন কমলে রফতানি বাড়বে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এছাড়া যানজট না থাকলে ট্রাক অপারেটরের খরচ কমবে ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
তিনি আরো বলেন, ‘২০০০ সালের দিকে ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশের রফতানি আয় প্রায় একই ছিল। সেখান থেকে আমরা উন্নতি করেছি বটে। কিন্তু ভিয়েতনামের রফতানি আয় যেখানে ৪০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, সেখানে আমরা এখনো ৫৫-৬৬ বিলিয়ন ডলারে আটকে আছি। বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমেই ভিয়েতনাম এ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন সূচক তুলনা করলেই তা আরো ভালোভাবে টের পাওয়া যাবে।’
ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘বন্দর ব্যবস্থাপনায়ও বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। দেশ থেকে কোনো পণ্য রফতানি করতে সময় লাগে ৩১৫ ঘণ্টা। বিপরীতে ভিয়েতনাম ও ভারত থেকে লাগে যথাক্রমে ১০৫ ও ৬৪ ঘণ্টা। বাংলাদেশে যে পণ্য আমদানি করতে লজিস্টিকস ব্যয় হয় ১ হাজার ২৭০ ডলার, একই পণ্য আমদানি করতে ভারতে ব্যয় হয় ৩৬৬ ডলার ও ভিয়েতনামের ৫৫৬ ডলার।’ এসব সমস্যা সমাধানে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ওপর জোর দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী বলেন, ‘লজিস্টিক খাতের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা দেশের রফতানি সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। আমরা প্রতিনিয়ত প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে পড়ছি। বন্দরগুলোয় পণ্য খালাসে দীর্ঘ সময়, পরিবহনে ধীরগতি এবং আধুনিক কোল্ড-চেইন লজিস্টিকসের সীমাবদ্ধতা আমাদের সামগ্রিক সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাকে ব্যয়বহুল ও মন্থর করে তুলেছে।’
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক ‘মাল্টিমোডাল’ পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
সভায় আরো বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত সচিব মো. হাবিবুর রহমান, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান, শাহরিয়ার স্টিল মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসকে মাসাদুল আলম মাসুদ, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার হুমায়ুন কবির এবং বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সিনিয়র ট্রান্সপোর্ট স্পেশালিস্ট নুসরাত নাহিদ বাবী।










