বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে সংসদীয় পর্যায়ে যোগাযোগ ও আদান-প্রদান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে সংসদীয় যোগাযোগ বাড়ানো হলে পারস্পরিক অগ্রাধিকার সম্পর্কে বোঝাপড়া আরো গভীর হবে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার জন্য শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হবে।

গতকাল রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে ৩০তম ইউএস ট্রেড শোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্পিকার। অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন, অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামালসহ ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন। অ্যামচেম বাংলাদেশ ও ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস যৌথভাবে তিন দিনব্যাপী এ ট্রেড শোর আয়োজন করেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য, সেবা ও উদ্ভাবনের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরা হচ্ছে।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা মূলত তিনটি বিষয় চান। এগুলো হলো পূর্বাভাসযোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন। আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সংসদ এসব বিষয় নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে।’ ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের দ্বার ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।’

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংসদীয় পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে দুই দেশের পারস্পরিক অগ্রাধিকারগুলো সম্পর্কে আরো ভালোভাবে বোঝাপড়া তৈরি হবে এবং অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে উঠবে।’ ৩০তম ইউএস ট্রেড শোকে দুদেশের সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধানের সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন স্পিকার বলেন, ‘ইউএস ট্রেড শো প্রথাগত সহযোগিতার ক্ষেত্রের বাইরে গিয়ে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, বিনিয়োগ, জ্ঞান বিনিময় এবং শিল্প উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধানের একটি চমৎকার সুযোগ তৈরি করে।’

অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘দুটি দেশের মধ্যে ভালো সম্পর্কের জন্য বাণিজ্যিক সম্পর্ক মৌলিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক দিয়ে কোথাও কাজ হবে না। এমনকি প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্কের অর্থ হলো জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক এবং একই সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক।’

তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমি যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম, তখন নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি ও কানেকটিকাট—এ তিনটি অঙ্গরাজ্য নিয়ে গঠিত ট্রাই-স্টেট এলাকায় মাত্র ৩৬ জন বাংলাদেশী ছিলেন। তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। এখন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো শহরে একটি ভবনেই ৩৬ বাংলাদেশীকে পাওয়া যাবে।’

মন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ। আরো প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিল্প খাতে দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিবেশগত স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা জোরদারে মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষতা ও বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার রূপরেখা হিসেবে অভিহিত করে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বলেন, এ চুক্তি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের ওপর একটি বাজি। বাণিজ্য তখনই সবচেয়ে ভালো কাজ করে, যখন তা ন্যায্য, পারস্পরিক এবং দৃশ্যমান ফলাফল বয়ে আনে।’

রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে কাজ করছে অ্যামচেম। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা, সমাধান তৈরি, বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সংগঠনটি কাজ করছে।’ এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে অ্যামচেমের ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার তুলে ধরে ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বলেন, ‘আমেরিকান কোম্পানিগুলোর জন্য সুযোগ সম্প্রসারণ, মার্কিন কর্মীদের সহায়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি বাড়ানোই তাদের লক্ষ্য। যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বর্তমানে একটি সম্ভাবনাময় সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’

পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এ চুক্তির মাধ্যমে দুদেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উন্মোচন করা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সেরা পণ্য ও সেবা সরবরাহ করে। এর সঙ্গে আসে উচ্চ মানের উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা। কোনো দেশে মার্কিন কোম্পানি কার্যক্রম শুরু করলে কিংবা বিনিয়োগ করলে সেখানে মানসম্মত ও ভালো বেতনের কর্মসংস্থানও তৈরি হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য এসব সুযোগ উন্মুক্ত করার পথ তৈরি করছে।’ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিকে কেন্দ্র করে দুদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রদূত। তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ও সেবার পাশাপাশি দেশটির উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে। এসব বিনিয়োগের ফলে দেশে মানসম্মত ও ভালো বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে।