প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের পর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি আনতে পারেনি বস্ত্র খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানি প্যাসিফিক ডেনিমস লিমিটেড। অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইপিওর অর্থ ব্যবহার না করার পাশাপাশি অনিয়মের কারণে কোম্পানিটির পরিচালকদের জরিমানাও গুনতে হয়েছে। অবশ্য কোম্পানিটির কর্মকর্তারা বলছেন, এ বছরের মার্চের মধ্যেই আইপিওর টাকায় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি আমদানি ও স্থাপনের কাজ শেষ হবে।
প্যাসিফিক ডেনিমসের আইপিও তহবিল ব্যবহারসংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, এ বছরের জানুয়ারি শেষে কোম্পানিটি আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত ৭৫ কোটি টাকার মধ্যে ৫৪ কোটি ৯৮ লাখ ২১ হাজার ৪৪৭ টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে ব্যাংকঋণ বাবদ ২৫ কোটি ও ভবন নির্মাণ বাবদ বরাদ্দকৃত ২৭ কোটি ৯২ লাখ ১ হাজার ৪৪৭ টাকার পুরোটাই ব্যয় করা হয়েছে। তাছাড়া আইপিও প্রক্রিয়ার ব্যয় নির্বাহের জন্য বরাদ্দকৃত ২ কোটি ৬ লাখ ২০ হাজার টাকার পুরোটাই খরচ করা হয়েছে। অন্যদিকে যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি আমদানির জন্য বরাদ্দকৃত ২০ কোটি ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫৫৩ টাকার পুরোটাই অব্যবহূত রয়েছে।
এ বছরের জানুয়ারি মাসে প্যাসিফিক ডেনিমসের আইপিও তহবিল ব্যবহারসংক্রান্ত প্রতিবেদনটি প্রত্যয়ণ করেছে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস। কোম্পানিটির আইপিও তহবিল ব্যবহারের বিষয়ে নিরীক্ষক বলছেন, প্রসপেক্টাস অনুসারে ভবন নির্মাণের জন্য ২৯ কোটি ৮৩ লাখ ৭৩ হাজার ৭২৩ টাকা বরাদ্দ থাকলেও প্যাসিফিক ডেনিমস এ খাতে ২৭ কোটি ৯২ লাখ ১ হাজার ৪৪৭ টাকা ব্যয় করেছে। অবশিষ্ট ১ কোটি ৯১ লাখ ৭২ হাজার ২৭৬ টাকা যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি খাতে ব্যয়ের জন্য স্থানান্তর করা হয়েছে। যা গত বছরের ১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত কোম্পানিটির বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) অনুমোদন করা হয়েছে। তাছাড়া গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্যাসিফিক ডেনিমস যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি বাবদ ২০ কোটি ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫০০ টাকা অগ্রিম পরিশোধ করেছে বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক।
ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতির আইপিওর মাধ্যমে ২০১৭ সালের শুরুতে পুঁজিবাজার থেকে ৭৫ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করে প্যাসিফিক ডেনিমস। একই বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি আইপিওর অর্থ কোম্পানিটির হাতে আসে। প্রসপেক্টাস অনুসারে আইপিওর অর্থ হাতে পাওয়ার দুই বছর বা ২০১৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভবন নির্মাণ এবং যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি আমদানি ও কারখানায় স্থাপনের সময়সীমা নির্ধারিত ছিল। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে অর্থ ব্যয় করতে না পারায় শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন নিয়ে অর্থ ব্যবহারের সময়সীমা ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছিল প্যাসিফিক ডেনিমস। কিন্তু এ দফায়ও যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি বাবদ বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করতে না পেরে দ্বিতীয় দফায় এ বছরের মার্চ পর্যন্ত আইপিও তহবিল ব্যবহারের সময়সীমা বাড়িয়েছে কোম্পানিটি।
জানতে চাইলে প্যাসিফিক ডেনিমসের কোম্পানি সচিব সোরাব আলী বণিক বার্তাকে বলেন, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি আমদানির জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের পুরোটাই অগ্রিম হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক সব প্রক্রিয়া শেষ। আশা করছি, এ মাসের মধ্যেই কারখানায় সব যন্ত্রপাতি এসে পৌঁছবে। আমরা সর্বশেষ এজিএমে এ বছরের মার্চের মধ্যে আইপিওর অর্থ ব্যয়ের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন নিয়েছি। এ সময়ের মধ্যেই কারখানায় যন্ত্রপাতি স্থাপন ও চালু করা সম্ভব হবে। যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি বাবদ অর্থ অগ্রিম পরিশোধ করা হলেও এগুলো হাতে এসে না পৌঁছার কারণে আইপিও তহবিল ব্যবহারসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ খাতে অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি দেখানো যায়নি বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে পুঁজিবাজারে আসার আগে আইপিওর অর্থ হাতে পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে ২৫ কোটি টাকার ঋণ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দুই ব্যাংক ও তিন ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এনওসি নিয়েছিল প্যাসিফিক ডেনিমস। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণের টাকা পরিশোধ না করায় কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিএসইসির কাছে অভিযোগ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানিটির আইপিও তহবিল ব্যবহারের বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখতে ম্যাবস অ্যান্ড জে পার্টনার্সকে বিশেষ নিরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ করে কমিশন।
বিশেষ নিরীক্ষকের প্রতিবেদন অনুসারে, প্যাসিফিক ডেনিমসের বিরুদ্ধে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাংকঋণ পরিশোধ না করার পাশাপাশি, নগদে অর্থ ব্যয়, বিশেষ নিরীক্ষককে সহায়তা না করা, আইপিওর অর্থ অপব্যবহার এবং কমিশনের কাছে মিথ্যা তথ্য দেয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসির ৬৬৮তম কমিশন সভায় আইপিও তহবিলের অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের কারণে প্যাসিফিক ডেনিমসের চেয়ারম্যান মো. সাদেকুল আলম ইয়াসিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শফিউল আজম মহসিন, পরিচালক মো. সোহেল খান এবং পর্ষদে ডিজনি প্রপার্টিজ লিমিটেডের মনোনীত পরিচালক এমএ কামাল ভূঁইয়াকে আলাদা আলাদাভাবে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করে কমিশন। তাছাড়া একই রসিদে একাধিকবার টাকা পরিশোধ দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে লেনদেনের কারণে প্যাসিফিক ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে এ অর্থ কোম্পানিতে ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেয় বিএসইসি।










