রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল আয়োজিত ‘বিল্ডিং ইনভেস্টরস কনফিডেন্স: ফ্রম পলিসি রিফর্ম টু ইফেক্টিভ ইমপ্লিমেন্টেশন’ শীর্ষক আলোচনার শুরুতে সংগঠনটির সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল এ কথা বলেন। তিনি বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ আরো বাড়ানোর যেসব সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলো তুলে ধরেন। বিশেষ করে উদীয়মান ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে সম্ভাবনা বেশি বলে উল্লেখ করেন এ ব্যবসায়ী নেতা।
অ্যামচেম আয়োজিত এ আলোচনায় অংশ নেন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী নেতা ও বিনিয়োগকারীরা। প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। চলমান সংকট সমাধানে কিছুটা সময় চেয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটি পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কারণ এ পরিস্থিতি আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। বর্তমানে আমরা যে অবস্থার মধ্যে আছি, তার মধ্যে অর্থনীতি; বিশেষত আর্থিক খাতের বিষয়টি উল্লেখ করতে হয়। অবকাঠামোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আপনারা এখন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের কথা বলেছেন। বাস্তবতা হলো আসলেই আমরা সমস্যার মধ্যে আছি। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যার কোনো সমাধান ছয় মাসের মধ্যে করা সম্ভব নয়। এক বছরের মধ্যেও সম্ভব নয়। এজন্য ন্যূনতম দুই বছর সময় লাগবে।’
জ্বালানি ছাড়া বিকল্প উৎসের মাধ্যমে অর্থনীতি এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয় উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সংকট সমাধানে আমরা বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিয়ে কাজ করছি। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি, যত দ্রুত সম্ভব আমরা সবকিছু করার চেষ্টা করছি। গ্যাসের ক্ষেত্রে ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ), অনশোর স্টোরেজ—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন ও সঞ্চালন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে যে পরিসংখ্যান দেয়া হচ্ছে, তার চেয়েও অনেক খারাপ অবস্থা। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিদ্যুতের জ্বালানি দুটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে আমরা নীতিগতভাবে একটি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় আছি।’
সরকার একটি মিশ্র জ্বালানি ব্যবস্থার পরিকল্পনা করছে জানিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি রাখব। গ্যাসভিত্তিক জ্বালানি থাকবে। কয়লাও আমাদের একটি সম্পদ, তাই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ নিয়েও আমরা কাজ করছি। অর্থাৎ সামনে আমাদের একটি মিশ্র জ্বালানি ব্যবস্থা থাকবে। এ জ্বালানি মিশ্রণের বিষয়টি আমরা মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আশা করছি, যথাসময়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাব।’
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২০৩৪ সালের মধ্যে আমরা যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি, সেটি অর্জনের জন্য শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সব নাগরিকের কাছে পৌঁছাতে হলে শক্তিশালী ইন্টারনেট ছাড়া তা সম্ভব নয়। আপনারা সবসময় যে প্রযুক্তি খাত বা আইসিটি খাতের কথা বলেন, সেই খাতের উন্নয়নও শক্তিশালী ইন্টারনেট ছাড়া সম্ভব নয়।’
অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, ‘ব্যাংক খাতে মারাত্মক মূলধনের ঘাটতি আছে। এটা এত বেশি যে সরকারের পক্ষে পূরণ করার মতো নয়। খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি। তাই অর্থায়নের বিকল্প উৎস দরকার।’
সরকার ট্যারিফভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বের হয়ে আসতে চায় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আমাদের অনেক বড় ধরনের ব্যয় হয়েছে। ফলে আমাদের অর্থনৈতিক এরিয়া অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে। তাই আপনি যে দ্রুত পরিবর্তনের কথা বলছেন, আমরা খুব দ্রুত সেই পথে যেতে পারছি না। আমি বিশ্বাস করি, একটি দেশ ট্যারিফভিত্তিক অর্থনীতির ওপর টেকসইভাবে চলতে পারে না। আপনাকে ভ্যাট, ভোগব্যয় ও আয় থেকে কর রাজস্ব বাড়াতে হবে। এগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করা গেলে রাজস্ব ব্যবস্থাটি ভালোভাবে কাজ করবে।’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল। দেশে মার্কিন বিনিয়োগ আরো বাড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা যেসব মৌলিক বিষয় বিবেচনা করেন, তার অনেকগুলোই বাংলাদেশে রয়েছে। তবে এ সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও প্রকৃত বিনিয়োগে রূপ দিতে নীতিগত সংস্কারের ধারাবাহিক এবং কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। সংস্কারের উদ্যোগকে দৃশ্যমান ও পূর্বানুমানযোগ্য ফলাফলে রূপ দেয়ার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী করা সম্ভব।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন এইচএসবিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মাহবুব উর রহমান। তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্য মূলধনের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যার ভিত্তি হলো একটি স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ। বাণিজ্য আরো সহজ করা গেলে দেশী ও বিদেশী উভয় ধরনের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।’
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক, ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রুপালী হক চৌধুরী, ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, কোকা-কোলা বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাদাব আহমেদ খান, অ্যামচেমের সাবেক সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ প্রমুখ।









