আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রফতানি কমেছে। জাহাজ পর্যবেক্ষণের তথ্য বিশ্লেষকদের মতে, অত্যধিক তাপমাত্রার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে। এছাড়া কিছু প্রসেসিং প্লান্টের উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে রফতানিতে। এসব কারণে এলএনজি উৎপাদনে পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। খবর রয়টার্স।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে খরার প্রকোপ দেখা যায় এবং তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বাড়তে থাকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশটিতে বিদ্যুতের চাহিদাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিপুল এ চাহিদার বিপরীতে দেশটির সরবরাহকারীরা অধিবাসীদের স্বেচ্ছায় বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর আহ্বান জানিয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যার কারণে লুইজিয়ানার স্যাবাইন পাস ও টেক্সাসের করপাস ক্রিস্টিতে থাকা দুটি কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাতটি এলএনজি রফতানি প্লান্টে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। আগস্টে সরবরাহের পরিমাণ ছিল দিনপ্রতি ১ হাজার ২৩০ কোটি ঘনফুট। যেখানে জুলাইয়ে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৭০ কোটি ঘনফুট। এলএসইজি এইকন প্রকাশিত প্রাথমিক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর থেকে ১০২টি এলএনজিবাহী কার্গো গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। এগুলোর মাধ্যমে ৭৩ লাখ ২০ হাজার টনের বেশি এলএনজি সরবরাহ করা হয়েছে, যা আগের মাসের ৭৫ লাখ ১০ হাজার টনের তুলনায় কম।
যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত এলএনজির প্রধান গন্তব্যস্থল ইউরোপ। ৫২ শতাংশ কার্গোর এলএনজি এ অঞ্চলই পেয়ে থাকে। এরপর এশিয়ার ৩০ শতাংশ এবং দক্ষিণ আমেরিকা ও দ্য ক্যারিবিয়ানে ৭ শতাংশ এলএনজি রফতানি করা হয়ে থাকে। প্রবল খড়ার কারণে পানামা খালে সব ধরনের চলাচল ও পণ্য পরিবহন বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে এশিয়ায় এলএনজি সরবরাহকারী মার্কিন কোম্পানিগুলো সুয়েজ ক্যানেলের মাধ্যমে রফতানি করে থাকে। এটি ছাড়াও সবচেয়ে বেশি দূরত্বের যাত্রাপথ দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ব্যবহার করে থাকে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এলএনজি রফতানির জন্য যেসব ট্যাংকার পানামা খালকে বেছে নিয়েছিল, তারা সরবরাহের সময় আরো তিন সপ্তাহ বাড়িয়েছে।
আর্থিকপ্রতিষ্ঠান এলএসইজির তথ্যানুযায়ী, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন দিনপ্রতি ১০ হাজার ২২০ কোটি ঘনফুটে উত্তীর্ণ হয়েছে। যেখানে জুলাইয়ে এর পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ২১০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু টেক্সাসের গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের চাহিদা সরবরাহে ঘাটতি তৈরি করেছে। দৈনিক উত্তোলন ও সরবরাহে সংকট তৈরি হওয়ায় চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের ভবিষ্যৎ সরবরাহ মূল্য ২ শতাংশ বেড়ে টানা তিন সপ্তাহ ধরে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে। মূলত ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ৪৮টি প্রদেশে অত্যধিক তাপমাত্রা থাকার পূর্বাভাসের কারণে এ প্রভাব পড়েছে।
যু্ক্তরাষ্ট্রের রফতানি কমলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নে রুশ এলএনজি আমদানি উল্লেখজনকহারে বেড়েছে। ইউক্রেনে সামরিক আগ্রাসন শুরুর পর মস্কোর কাছ থেকে এলএনজি আমদানি কমানোর ঘোষণা দিয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
পরিবেশ পর্যবেক্ষক সংস্থা গ্লোবাল উইটনেস প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ইইউ ২ কোটি ১৬ লাখ কিউবিক মিটার রুশ এলএনজি কিনেছে। ২০২২ সালে ২ কোটি ১৩ লাখ কিউবিক মিটার কেনা হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের আমদানির সঙ্গে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী ২০২১ সালের পরিমাণ তুলনা করলে দেখা যায়, এর হার ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। ইউক্রেনে জোরপূর্বক প্রবেশ, হামলা চালানো ও নৃশংসতার জন্য মস্কোর সমালোচনা করে আসছে ইইউ। যদিও একই সঙ্গে রাশিয়া থেকে এলএনজি আমদানি বাড়িয়েছে এ অঞ্চলভুক্ত দেশগুলো।
বছরের প্রথম সাত মাসে রুশ এলএনজি আমদানিতে পাঁচটি দেশ শীর্ষে রয়েছে। এর মধ্যে চীন ৮৭ লাখ, স্পেন ৭৫ লাখ, বেলজিয়াম ৭১ লাখ, জাপান ৭০ লাখ ও ফ্রান্স ৪৫ লাখ কিউবিক মিটার এলএনজি আমদানি করেছে। উপকূলীয় দেশ হিসেবে স্পেন, বেলজিয়াম ও ফ্রান্স এখন এলএনজি সরবরাহকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।
রুশ এলএনজি ব্যবহারকারী হিসেবে নেদারল্যান্ডস, গ্রিস, পর্তুগাল, ফিনল্যান্ড, ইতালি, সুইডেনকেও তালিকাবদ্ধ করেছে গ্লোবাল উইটনেস। বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের কাছ থেকে জাহাজীকরণের তথ্য পাওয়া গেছে। সামগ্রিকভাবে ইইউ জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রফতানীকৃত রুশ এলএনজির ৫২ শতাংশই কিনেছে বলে তথ্যে জানা গেছে, যা ২০২২ সালের ৪৯ শতাংশ ও ২০২১ সালের ৩৯ শতাংশ বাজার হিস্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।










