এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যাংকগুলো তাদের প্রায় ৮০ শতাংশই ক্ষুদ্র ঋণ ও বেসরকারি সংস্থাকে (এমএফআই ও এনজিও) দিয়ে দেয়। সংস্থাগুলো ব্যাংক থেকে ৮-৯ শতাংশ সুদে ঋণ নিলেও গ্রাহক থেকে সে ঋণের সুদ আদায় করে ১৫-২৫ শতাংশ পর্যন্ত। এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন যেসব ব্যাংকের পাঁচ শতাধিক শাখা রয়েছে, তারা এমএফআই বা এনজিওর মাধ্যমে কৃষি ঋণ বিতরণ করতে পারবে না। এছাড়া ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের অন্তত ৪ শতাংশ পল্লী ও কৃষি খাতে বিতরণ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গতকাল প্রকাশিত চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা এবং কর্মসূচিতে ঋণ বিতরণের এসব নির্দেশনা দেয়া হয়। চলতি অর্থবছরে দেশের কৃষি খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোকে ২০ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকার ঋণ বিতরণের লক্ষ্য দেয়া হয়েছে। বাকি ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার বিতরণ করবে দেশের বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংকগুলো। ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যাংকগুলো নিজস্ব নেটওয়ার্ক (শাখা, উপশাখা, এজেন্ট ব্যাংকিং, কন্ট্রাক্ট ফার্মিং, দলবদ্ধ ঋণ বিতরণ) ও ব্যাংক-এমএফআই লিংকেজ ব্যবহার করতে পারবে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৫০ শতাংশের কম হতে পারবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী খাতে ৩৯ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণের লক্ষ্য ছিল। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও কৃষি খাতে বেশি ঋণ বিতরণ করতে পেরেছে।
প্রতি বছরই কৃষি খাতসংশ্লিষ্ট নিত্যনতুন বিষয় নিয়ে কৃষি ও গ্রামীণ ঋণ নীতিমালা তৈরি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এবারের নীতিমালায় উল্লেখযোগ্য সংযোজনগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রকৃত কৃষক শনাক্তকণের উদ্যোগ। এতে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, মৎস্যসম্পদ কর্মকর্তা ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রত্যয়ন কিংবা সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত কৃষক কার্ডসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে ঋণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া রয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ বিতরণের মতো বিষয়। অন্যদিকে রয়েছে নারী ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য অর্থায়ন সহজীকরণের লক্ষ্যে প্রচলিত জমি বা স্থাবর সম্পত্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও দলগত জামানত ব্যবহার। আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংক ও গ্রাহক পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্মতির ভিত্তিতে গ্রাহককে বীমা সুবিধার আওতায় আনার বিষয়েও বলা হয়েছে। এছাড়া ডিমের খোসা দিয়ে জৈব সার উৎপাদন এবং শিমুল মূল, অশ্বগন্ধা, মিশ্রি দানা, রোজেলা, শতমূল, গাছ আলু ও ব্লুবেরি চাষের ঋণ নিয়মাচার যুক্ত হয়েছে। সারা বছর আম, কলা, পেঁপে, লেবু, পেয়ারা ও লিচু চাষের ঋণ বিতরণ ও পরিশোধের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি হ্যাচারিতে মাছের পোনা, হাঁস-মুরগির বাচ্চা ও উট পালনকে নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, এ সহজীকৃত ও বর্ধিত ঋণপ্রবাহ দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণসহ দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কৃষি ও পল্লী খাতে যথাসময়ে পর্যাপ্ত অর্থের জোগান দেয়া প্রয়োজন। কৃষিপণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি; সর্বোপরি সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উন্নয়নে এ নীতিমালা ও কর্মসূচি কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।









