বিশ্বজুড়ে খাদ্যশস্যের বড় জোগানদাতা রাশিয়া ও ইউক্রেন। দেশ দুটির সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল বেশির ভাগ আমদানিকারক দেশ। কিন্তু দুদেশের মধ্যে ছয় সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধের কারণে এ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণে মূল্যবৃদ্ধির দিক থেকে একের পর এক রেকর্ড ভাঙছে খাদ্যপণ্য। এসব পণ্যের দৈনিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে আমদানিকারকদের। বিশেষ করে নিম্ন আগের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানায়, মার্চে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক দাম প্রায় ১৩ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্য দিয়ে মূল্যবৃদ্ধির নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিকভাবে সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হওয়া খাদ্যপণ্য নিয়ে প্রতি মাসেই মূল্যসূচক প্রকাশ করে এফএও। গত মাসে খাদ্যপণ্যের গড় মূল্যসূচক ১৫৯ দশমিক ৩ পয়েন্টে উঠে এসেছে। অথচ ফেব্রুয়ারিতে মূল্যসূচক ছিল ১৪১ দশমিক ৪ পয়েন্টে। তখন এটিই ছিল রেকর্ড সর্বোচ্চ দাম। 

রাশিয়া ও ইউক্রেন বিশ্বের শীর্ষ গম, ভুট্টা, যব ও সূর্যমুখী তেল রফতানিকারক। দেশ দুটি কৃষ্ণ সাগরীয় বন্দর ব্যবহার করে তাদের পণ্য রফতানি করে। কিন্তু মস্কো তার প্রতিবেশী দেশে হামলা চালানোয় খাদ্যশস্যের বাজারে তীব্র অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ কারণে ইউক্রেনের খাদ্যশস্য রফতানিতে স্থবিরতা নেমে এসেছে। 

এফএও গত মাসে জানায়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে খাদ্য ও পশুখাদ্যের দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি বিশ্বজুড়ে পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি প্রকট করে তুলছে।

মার্চে সংস্থাটির দানাদার খাদ্যশস্যের মূল্যসূচক ১৭ শতাংশ বেড়েছে, যা রেকর্ড সর্বোচ্চে। অন্যদিকে অতীতের যেকোনো সময়কে ছাড়িয়ে গেছে ভোজ্যতেলের দামও। এর মূল্যসূচক বেড়েছে ২৩ শতাংশ।

তথ্য বলছে, যুদ্ধের আগেই খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক দাম ১০ বছরের সর্বোচ্চে উঠে এসেছিল। কারণ খরাসহ বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে খাদ্যশস্য উৎপাদন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। বাজারে যখন এমন অস্থিরতা চলছিল, তখনি কৃষ্ণ সাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত বেধে যায়। এখানকার বন্দরগুলো দিয়ে শস্য ও ভোজ্যতেল পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে খাদ্যপণ্যের দাম। গত মাসে চিনি ও দুগ্ধপণ্যের দামও ব্যাপকভাবে বেড়েছে বলে জানায় এফএও।

তথ্য বলছে, বৈশ্বিক গম রফতানির এক-চতুর্থাংশই উৎপাদন হয় কৃষ্ণ সাগরীয় অঞ্চলে। কিন্তু ইউক্রেনের বন্দরগুলো বন্ধ হয়ে পড়ায় দেশটি থেকে গম ও ভুট্টা রফতানি সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞার কারণে আর্থিক ও জাহাজীকরণ জটিলতা দেখা দেয়ায় রাশিয়ার রফতানিও স্লথ হয়ে পড়েছে।

গমের বৈশ্বিক দাম ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। ভুট্টার দাম বেড়েছে ১৯ দশমিক ১ শতাংশ। যব ও সরগামের দামও বেড়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এফএও বলছে, বাজারে যেসব সমস্যা রয়েছে তা সহসাই কাটছে না। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সমস্যা আরো বাড়বে। এসব কারণে খাদ্যশস্য বিশেষ করে গমের বৈশ্বিক মজুদ তলানিতে নেমে আসছে। যে কারণে দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এফএও এক নোটে জানায়, ইউক্রেন বিশ্বের শীর্ষ সূর্যমুখী তেল রফতানিকারক। যুদ্ধের প্রভাবে পণ্যটির বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ায় দাম বেড়েছে। অন্যদিকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পাম অয়েল, সয়াবিন ও সরিষা তেলের দামও বেড়েছে। মার্চে এফএও ভোজ্যতেলের মূল্যসূচক আগের তুলনায় ২৩ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।

এফএও এর মুখপাত্র বলেন, এরই মধ্যে যেসব দেশ সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে সংকটের মধ্যে রয়েছে, সেসব দেশের জন্য ঊর্ধ্বমুধী দাম সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নিম্ন আয়ের ও খাদ্য ঘাটতিতে থাকা দেশগুলো পণ্যের অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে।