যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। গৃহস্থালি খরচ সামলাতে না পেরে এখন দৈনন্দিন চাল-ডাল ও মুদিপণ্য কিনতেও মানুষ কিস্তি সুবিধার দিকে ঝুঁকছে। দেশটির প্রায় ৩০ শতাংশ লোক এখন খাদ্যসামগ্রী কিনতে ‘বাই নাও, পে লেটার’ (বিএনপিএল) বা ‘এখন কিনুন, পরে শোধ করুন’ ঋণ সুবিধা ব্যবহার করছে। সেন্ট লুইসের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নতুন গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। খবর ফরচুন।
গবেষণা বলছে, নিত্যপণ্যে এ ধরনের ঋণ সুবিধার ব্যবহার বাড়ায় বিক্রেতারা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। ফলে যেসব ক্রেতা নগদ অর্থে পণ্য কিনছেন, দিনশেষে তাদেরও বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে।
বিএনপিএল হলো কিস্তিভিত্তিক পেমেন্ট বা স্বল্পমেয়াদি ঋণ সুবিধা। এর মাধ্যমে ক্রেতা যেকোনো পণ্য কিনতে পারেন, কিন্তু পুরো দাম একবারে না দিয়ে পরে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কয়েকটি কিস্তিতে পরিশোধ করেন।
স্মার্টফোন, আসবাবপত্র বা দামি ইলেকট্রনিক পণ্য কেনার জন্য মূলত ‘বাই নাও, পে লেটার’ সেবার প্রবর্তন। এসব পণ্যে বিক্রেতাদের মুনাফার হার বেশি। ফলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে ফি দিয়েও বিক্রেতাদের লাভ থাকে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। শিক্ষা, চিকিৎসা ও শিশু পরিচর্যার খরচ রেকর্ড বাড়ায় সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন কেনাকাটায়ও কিস্তি সুবিধা নিচ্ছেন।
লেন্ডিং ট্রির এক জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ৩০ শতাংশ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার কিনতে বিএনপিএল ঋণ ব্যবহার করছেন। দুই বছর আগে এ হার ছিল ১৪ শতাংশ। ক্লার্না, অ্যাফার্ম ও আফটার পের মতো বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে দেশটির প্রায় ৯ কোটি ১৫ লাখ মানুষ এ সুবিধা নিচ্ছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মুদিপণ্যে মুনাফার হার অনেক কম থাকে। এর ওপর যখন কোনো ক্রেতা কিস্তিতে পণ্য কেনেন, তখন বিক্রেতাকে ফিনটেক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে একটি নির্দিষ্ট ফি বা মাশুল দিতে হয়। তাই বিক্রেতারা নিজেদের মুনাফা ঠিক রাখতে পণ্যের মূল গায়ের দাম বা স্টিকার প্রাইস বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক পানোস কুভেলিস জানান, বিক্রেতারা এ ধরনের পেমেন্ট নেয়ার কারণে সামগ্রিকভাবে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারেন। ফলে যারা নগদ বা এককালীন পুরো টাকা দিয়ে কেনাকাটা করছেন, তারাও মূলত কিস্তিতে কেনা ক্রেতাদের ভর্তুকি দিচ্ছেন। এতে ঋণ না নেয়া সাধারণ ভোক্তাদেরও পকেট খালি হচ্ছে।
দাম বাড়ানোর পরও যদি কোনো পণ্য বিক্রি করে লাভ না হয়, তবে খুচরা বিক্রেতারা সে পণ্য দোকানে রাখা বন্ধ করে দিতে পারেন। এতে করে বাজারে পণ্যের বৈচিত্র্য ও বিকল্প কমে যাবে, যা শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর জন্য কিস্তির ঋণের ব্যবহার আরো একটি বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে। ফিনটেক খাতটি এখনো কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রণের অধীনে আসেনি। সাধারণ ব্যাংক ঋণের মতো এগুলো ক্রেডিট ব্যুরো বা ঋণ বিতরণ সংস্থার কাছে রিপোর্ট করা হয় না। ফলে অনেক ভোক্তা একই সময় একাধিক অ্যাপ থেকে ৫-১০টি পর্যন্ত ছোট ছোট ঋণ নিচ্ছেন। এতে বাজারে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের অনিয়ন্ত্রিত ‘অদৃশ্য ঋণ’ বা ‘ফ্যান্টম ডেট’।
অবশ্য এসব ঋণের গড় পরিমাণ খুব বেশি নয়, গড়ে প্রায় ১৩৫ ডলার। স্বল্পমেয়াদি ঋণ হওয়ায় গ্রাহকরা সাধারণত এসব ঋণ দ্রুত পরিশোধের চেষ্টা করেন। তার পরও ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায় না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সার্বিক অর্থনীতি ও খুচরা বাজার বড় ধরনের ধাক্কার সম্মুখীন হতে পারে।
মুদিপণ্য কেনার ক্ষেত্রে বিএনপিএল ব্যবহারের প্রবণতাকে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ থেকেও আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। দেশটিতে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আগস্টে ভোক্তা মূল্যসূচক আগের মাসের তুলনায় দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। একই মাসে জ্বালানি খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জ্বালানি সূচক ২ দশমিক ১ শতাংশ ও পেট্রলের দাম ৩ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি খরচ বেড়েছে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু গাড়ি চালানোর খরচে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয়ও বাড়ে। ফলে উৎপাদক ও খুচরা বিক্রেতাদের ওপর বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হয়। এর একটি অংশ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে চলে আসতে পারে।
বিশেষ করে মুদি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে এ চাপ ভোক্তার মাসিক বাজেটকে আরো সংকুচিত করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি দামের ওঠানামা মার্কিন ভোক্তাদের ব্যয় পরিকল্পনায়ও প্রভাব ফেলছে বলে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে।
এ পরিস্থিতিতে পরিবারের আয় একই হারে না বাড়লে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্য মানুষকে বিকল্প অর্থের উৎস খুঁজতে হয়। বিএনপিএল সেখানে সহজ একটি পথ হিসেবে হাজির হচ্ছে। ক্রেতা পুরো অর্থ একবারে না দিয়ে কয়েক দফায় পরিশোধের সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে মাসের বাজারের মতো ছোট, কিন্তু জরুরি কেনাকাটাও এখন ঋণের মাধ্যমে মেটানো সম্ভব হচ্ছে।










