যুক্তরাজ্যে একজন সাধারণ কর্মী সারা বছর খেটে যে পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেন, একজন সিইওর তা আয় করতে সময় লাগে মাত্র ২৯ ঘণ্টা। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পরিসংখ্যান শুধু ব্যক্তিগত আয়ের বৈষম্য নয়, বরং ক্ষমতা ও দরকষাকষির সামর্থ্য এবং শ্রমবাজারের কাঠামোগত অসাম্যেরও প্রতিফলন। একদিকে কোটি কোটি কর্মী মাসের শেষে খরচ মেটাতে লড়াই করছেন, অন্যদিকে অল্প কয়েকজন নির্বাহীর হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক মূল্য। খবর গার্ডিয়ান।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান হাই পে সেন্টারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি দুপুর পর্যন্ত এফটিএসই ১০০ সূচকে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সিইওরা এত অর্থ আয় করেছেন যা একজন গড়পড়তা অবস্থানের কর্মীর সারা বছরের উপার্জনের সমপরিমাণ।
এফটিএসই ১০০ কোম্পানির সিইওদের বার্ষিক আয়ের গড় মধ্যমা হলো ৪৪ লাখ পাউন্ড, যা একজন পূর্ণকালীন কর্মীর আয়ের গড় মধ্যমা ৩৯ হাজার ৩৯ পাউন্ডের তুলনায় ১১৩ গুণ। অর্থাৎ শীর্ষ ব্রিটিশ নির্বাহীরা ২৯ ঘণ্টারও কম সময় কাজ করেই কর্মীদের গড় বার্ষিক আয়ের বেশি অর্থ উপার্জন করে ফেলেন। যদি তারা ২ জানুয়ারি কাজ শুরু করেন, তাহলে ৬ জানুয়ারি বেলা ১১টা ৩০ মিনিটের মধ্যেই সেই সীমা অতিক্রম হয়ে যায়।
উল্লিখিত কোম্পানিগুলোর একজন সিইওর ঘণ্টাপ্রতি বেতনের গড় মধ্যমা ১ হাজার ৩৫৩ পাউন্ড ২৩ পেনি, অর্থাৎ মিনিটে প্রায় ২৩ পাউন্ড। হাই পে সেন্টারের হিসাব অনুসারে, এ নির্বাহীরা সপ্তাহে গড়ে সাড়ে ৬২ ঘণ্টা কাজ করেন।
গত বছর সবচেয়ে বেশি বেতন পাওয়া নির্বাহী ছিলেন যথাক্রমে প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান মেলরোজ ইন্ডাস্ট্রিজের বর্তমান ও সাবেক প্রধান নির্বাহী পিটার ডিলনট ও সাইমন পেকহ্যাম। দীর্ঘমেয়াদি প্রণোদনা পরিকল্পনার কারণে দুজন সম্মিলিতভাবে আয় করেছেন প্রায় ৫ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ড। ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রধান নির্বাহী পাস্কাল সোরিও আগের দুই বছর সবচেয়ে বেশি বেতন পাওয়া বস ছিলেন। এবার ১ কোটি ৪৭ লাখ পাউন্ড আয় করে তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছেন।
বেতনের এ ব্যবধান প্রসঙ্গে ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেসের (টিইউসি) মহাসচিব পল নোভাক বলেন, ‘যখন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের লাখ লাখ কর্মী জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন একেবারে শীর্ষে থাকা লোকেরা নিজেদের জন্য পিঠার বড় ভাগ নিয়ে নিচ্ছেন।’
নির্বাহীদের বেতন নির্ধারণ কমিটিতে কর্মীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে ‘বোর্ডরুমের লোভ’ নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বানও জানান তিনি। হাই পে সেন্টারও বলছে, আয়ের ব্যবধার ক্রমেই বড় হওয়ার অন্যতম কারণ ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়া।
গত মাসে এমপ্লয়মেন্ট রাইটস অ্যাক্ট পাস করেছে যুক্তরাজ্যের লেবার সরকার। এর আওতায় কর্মস্থলে ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার থাকবে কর্মীদের। পাশাপাশি নতুন কর্মীরাও ইউনিয়নে যোগ দিতে পারবেন।
হাই পে সেন্টারের অন্তর্বর্তী পরিচালক অ্যান্ড্রু স্পেকের মতে, ‘পরিসংখ্যান বলছে অল্পসংখ্যক শীর্ষ নির্বাহীর কাজকে যেভাবে মূল্যায়ন করা হয়, তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের শ্রমের মূল্যায়নের মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে।’
তার মতে, ব্রিটিশ অর্থনীতিতে মজুরি বৈষম্য ও কর্মীদের কণ্ঠস্বরের ঘাটতি কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে এমপ্লয়মেন্ট রাইটস অ্যাক্ট। তবে এর সঙ্গে আরো সাহসী করপোরেট গভর্ন্যান্স সংস্কার দরকার। এর আওতায় সব বড় কোম্পানির বোর্ডে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কর্মীর প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
গত বছর হাই পে সেন্টার দেখায়, এফটিএসই ১০০ কোম্পানির সিইওদের বেতনের গড় মধ্যমা কর্মীদের তুলনায় ৭৮ গুণ বেশি। আর সর্বনিম্ন আয়ের ২৫ শতাংশ কর্মীর সঙ্গে তুলনা করা হলে ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় ১০৬ গুণ।








