বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে ইউনাইটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (ইউএনডিপি) কার্যক্রমে। সরকারগুলোর সীমিত তহবিল ও পশ্চিমাদের বাজেট কাটছাঁটের কারণে সংকুচিত অবস্থায় রয়েছে সংস্থাটি। এ পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি অর্থ ব্যবহারে আরো সতর্কতার কথা বলেছেন ইউএনডিপির প্রধান আলেকজান্দার দে ক্রু। এ পরিস্থিতির উত্তরণে ব্যবসায়িক ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আরো তহবিল আকর্ষণের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। খবর এফটি।

বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিগুলো সাম্প্রতিক বছরে ধীর প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি মোকাবেলা করে আসছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুরক্ষাবাদী অর্থনৈতিক নীতি ও উন্নয়ন সংস্থাবিরোধী অবস্থান। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তহবিল সংস্থানে বিকল্প কৌশলের কথা ভাবছে। এর মধ্যে এগিয়ে রয়েছে বেসরকারি খাত থেকে তহবিলের জোগান। এ বিষয়ে ইউএনডিপি প্রধান আলেকজান্দার দে ক্রু বলেন, ‘বর্তমানে উন্নয়নের চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত, এ বিষয়ে সত্যিই কোনো সন্দেহ নেই।’

তার মতে, সরকারি তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইউএনডিপিকে আরো বেশি যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। পশ্চিমা দেশ বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট কাটছাঁটের কড়া নীতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তিনি জানান, সহায়তার অভাবে জাতিসংঘের ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সব হয়তো পূরণ সম্ভব হবে না। এর মধ্যে রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য নির্মূলের লক্ষ্য।

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২৫ সালের মধ্যে উন্নত অর্থনীতিগুলোর সহায়তা বাবদ দেয়া অফিশিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্টের (ওডিএ) প্রায় এক-চতুর্থাংশ বাদ পড়েছে। এর আকার প্রায় ৬ হাজার কোটি ডলার। বিপুল অংকের এ অর্থ উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক ও কল্যাণমূলক সহায়তা হিসেবে ব্যয়ের জন্য পরিকল্পিত ছিল।

গত আগস্টে ওডিএ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘এটি এমন সাহায্য, যা সরকারগুলোকে নিজেদের নাগরিকদের দায়িত্ব এড়াতে উৎসাহ দেয়।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, কভিড-মহামারীর পর শীর্ষ অর্থনৈতিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সহায়তা বাজেট চাপের মধ্যে এসেছে। সরকারগুলো এখন আগের তুলনায় প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়িয়েছে। স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়নের বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে। ওইসিডির তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে প্রায় তিন দশক পর প্রথমবারের মতো সহায়তা বাজেট কমিয়েছে ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র।

আলেকজান্দার দে ক্রু বলেন, ‘সরকারি অর্থ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আমাদের আরো বেশি যাচাই-বাছাই করতে হবে। শুধু সেখানে এ অর্থ বিনিয়োগ করব, যেখানে বেসরকারি খাত থেকে বিনিয়োগ সম্ভব নয়।’

বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে সরকারি সহায়তা খরচের পক্ষেও তিনি। এ বিষয়ে বলেন, ‘বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এমন ক্ষেত্রে সরকারি অর্থ ব্যবহার করা উচিত।’

আলেকজান্দার দে ক্রু জানান, উন্নয়নশীল দেশের বেশির ভাগই এখন বিনিয়োগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে যেসব দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ কম, সেখানে সরকারি সাহায্য দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ২৫টি উন্নয়নশীল দেশের ক্রেডিট রেটিং বিনিয়োগযোগ্য রয়েছে। ২০২০-২৫ সালের মধ্যে ৩৫টি দেশের রেটিং কমেছে।

গত বছরের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করেন। এর পর থেকে জাতিসংঘ ও সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন খাতের ওপর প্রচণ্ড চাপ এসেছে। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘকে আক্রমণ করে ট্রাম্প বলেন, ‘যে সমস্যাগুলোর সমাধান করা উচিত জাতিসংঘ তা করছে না। বরং প্রায়ই আমাদের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করছে।’

দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকে ট্রাম্প প্রশাসন ইউএসএআইডির বাজেটের ৮০ শতাংশের বেশি কমিয়েছে। এছাড়া ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছে, যার মধ্যে ৩১টিই জাতিসংঘের অন্তর্গত। অবশ্য নেতিবাচক অবস্থান সত্ত্বেও হোয়াইট হাউজ এখনো ইউএনডিপি থেকে পুরোপুরি সরে যায়নি।

সম্প্রতি গাজার জন্য ‘বোর্ড অব পিস’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এ পদক্ষেপকে সরাসরি জাতিসংঘের প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকদের একটি অংশ। তবে গত সপ্তাহে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) আয়োজিত দাভোস সম্মেলনে তিনি জানান, জাতিসংঘের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করবে বোর্ড অব পিস।

অবশ্য আলেকজান্দার দে ক্রুর মতে, এ বোর্ডকে জাতিসংঘের কার্যকারিতা প্রদর্শনের একটি সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। তিনি আশা করেন, গাজায় নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরতে পারবে সংস্থাটি।

বেলজিয়ামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্দার দে ক্রু গত নভেম্বরে প্রধান হিসেবে ইউএনডিপিতে যোগ দেন। তিনি জানান, মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে ইউএনডিপি। অনুদানের ক্ষেত্রে নীতিগতভাবে সম্মত হতে পারে এমন ‘সাধারণ ভিত্তি’ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে উভয় পক্ষ।

ইউএনডিপি-প্রধান বলেন, ‘বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্কে অনেক বিষয় রয়েছে। যেমন চরমপন্থা, অভিবাসন প্রবাহ ও ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। এর মূল কারণ উন্নয়নের ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্কিত।’