দুই বছর আগে জাতিসংঘের এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, ২১০০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা হবে ১ হাজার ৪০ কোটি। কিন্তু এখন সংশোধিত তথ্য বলছে, চলতি শতকের শেষ নাগাদ এ পূর্বাভাসের তুলনায় ২০ কোটি মানুষ কম থাকবে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বিশ্বের জনসংখ্যার ওপর জন্মহার হ্রাসের প্রভাব বেশ নাটকীয় হয়ে উঠেছে। ২০৮৪ সাল নাগাদ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার চূড়ায় পৌঁছাবে, যা আগে দেয়া পূর্বাভাস পাল্টে দিয়েছে। সেই সঙ্গে দেশগুলোকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

প্রতি দুই বছর অন্তর প্রকাশ হয় জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্টস ২০২৪’। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৮২০ কোটি জনসংখ্যা থেকে ২০৮৪ সালে বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১ হাজার ৩০ কোটি। আর শতক শেষ হওয়ার আগেই জনসংখ্যা নেমে আসবে ১ হাজার ২০ কোটিতে।

২০২২ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জাতিসংঘ বলেছিল, ২০৮০ এর দশক নাগাদ জনসংখ্যা বৃদ্ধি শীর্ষ পৌঁছবে। ওই সময় বিশ্বে মানুষ হবে ১ হাজার ৪০ কোটি। ২১০০ সাল পর্যন্ত এ স্তর বিদ্যমান থাকবে। প্রতিবেদনের আগের সংস্করণগুলোয় জনসংখ্যা বৃদ্ধির এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল।

প্রতিবেদন সম্পর্কে জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল লি জুনহুয়া বলেন, ‘জনসংখ্যার বিন্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। আগে উচ্চ জন্মহারের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল— এমন কিছু দেশে জন্মহার তার চেয়ে কম দেখা যাচ্ছে। কিছু উচ্চ জন্মহারের অঞ্চলে বেশ দ্রুত হ্রাসও দেখছি।’

বিশ্বব্যাপী নারীরা ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় এখন গড়ে এক সন্তানের কম জন্ম দিচ্ছেন বলে জানানো হয় প্রতিবেদনে। আরো বলা হচ্ছে, অর্ধেকের বেশি দেশে নারীপ্রতি জীবিত সন্তান জন্মদানের হার এখন ২ দশমিক ১ শতাংশের নিচে। তবে জন্মহারের এ স্তর স্থিতিশীল। অন্যদিকে চীন, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া ও স্পেনসহ এক-পঞ্চমাংশ দেশে নারীপ্রতি জীবিত সন্তান জন্মের হার ১ দশমিক ৪ শতাংশ। যাকে জাতিসংঘ বলছে, ‘অতি নিম্ন জন্মহার’।

জন্মহার পতনের সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গিকে মুখ্য হিসেবে দেখছেন ভিয়েনার ভিটগেনস্টাইন সেন্টার ফর ডেমোগ্রাফি অ্যান্ড গ্লোবাল হিউম্যান ক্যাপিটালের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ভলফগ্যাং লুটজ। তিনি বলেন, ‘প্রজনন হারে পতনের সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের মূল্যবোধ পরিবর্তন জড়িত। আগের প্রজন্ম সন্তান জন্মদানকে সফল জীবনের মূল দিকগুলোর একটি হিসেবে দেখলেও এখনকার তরুণরা তেমনটা ভাবেন না।’

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লিখিত ৬৩টি অঞ্চলে বর্তমানে বিশ্বের ২৮ শতাংশ মানুষের বসবাস। এর মধ্যে রয়েছে চীন, জার্মানি ও জাপান। এ দেশগুলো এরই মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির শীর্ষ স্তর ছুঁয়েছে। ২০২০ সালের শীর্ষ স্তরের তুলনায় ২১০০ সাল নাগাদ ইউরোপের জনসংখ্যা ২১ শতাংশ কমে যাবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হচ্ছে। এটি যেকোনো মহাদেশের হিসেবে বড় ধরনের পতন।

জনসংখ্যার এ পতনকে পুরোপুরি নেতিবাচকভাবে দেখেন না অনেকে। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে কার্বন নিঃসরণ করে— এমন কার্যকলাপ কমতে পারে। এছাড়া খাদ্য উৎপাদন, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের জন্য বন উজাড়ের মতো ঘটনা কমবে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, বর্তমানে বছরে প্রতিটি মানুষ গড়ে ৪ দশমিক ৩ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণে অবদান রাখে। কিন্তু কার্বন নিঃসরণে অনেক বেশি অবদান রাখলেও পশ্চিমা দেশগুলোকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয় না। জুনহুয়া বলেন, ‘বৈশ্বিক জনসংখ্যার শীর্ষ স্তর পূর্বাভাসের আগে অতিক্রম করা একটি আশাব্যঞ্জক বিষয়। এ কারণে জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় পরিবেশের ওপর চাপ কমতে পারে।’

তবে এটিও মনে রাখতে হবে, কর্মক্ষম জনসংখ্যার পতন ও বয়স্কদের সংখ্যা বাড়লে তা পাবলিক ফাইন্যান্সের মতো নতুন চাপ তৈরি করবে। এ বিষয়ে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক চার্লস গুডহার্ট বলেছেন, ‘সমস্যা হলো যে কম কর্মী মানে কম প্রবৃদ্ধি ও কম কর। এছাড়া বয়স্কদের জন্য আরো যত্ন, ওষুধ ও সেবামূলক সহায়তা দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘যদি ওষুধ ও চিকিৎসাবিজ্ঞান বয়স্কদের রোগের মোকাবেলা করতে না পারে, তাহলে সমাজে অনেক বেশি বৃদ্ধ থাকবেন যাদের দেখাশোনা করার জন্য খুব কম যুবক থাকবে।’

এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখনই পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যা বাড়ছে, এমন দেশগুলো উৎপাদনশীলতা ও কর্মজীবন প্রসারিত করতে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শও দিয়েছে সংস্থাটি।