চলতি বছরের শুরুতেই মহামারীর কবলে পড়েছে গোটা বিশ্ব। বছরের প্রথম চার মাস (জানুয়ারি-এপ্রিল) অস্থিরতার মধ্য দিয়ে পার করেছে বিশ্ববাসী। এর জের ধরে বছরের প্রথম তিন মাসে স্বর্ণ অলংকার উৎপাদনে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছিল, চলতি বছর মূল্যবান ধাতুটির বৈশ্বিক চাহিদা ব্যাপক হারে কমে যেতে পারে। তবে এর বিপরীতে বিনিয়োগকারীরা পণ্যটির মজুদ বৃদ্ধিতে ঝুঁকেছেন। ফলে স্বর্ণের চাহিদা হ্রাসের যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তা অনেকটা স্থিতিশীল হয়ে এসেছে বলে মনে করছে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (ডব্লিউজিসি)। খবর রয়টার্স।

নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে বছরের প্রথম মাসেই লকডাউন জারি করে চীন। পরিবহন ও বিভিন্ন শিল্প খাতে সীমা টেনে দেয় দেশটি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের শীর্ষ স্বর্ণ ব্যবহারকারী দেশটিতে স্বর্ণ অলংকার উৎপাদনে ধস নামে। এদিকে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ স্বর্ণ অলংকার ব্যবহারকারী দেশ ভারতের অবস্থাও একই। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশটিতে স্বর্ণ অলংকারের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এর জের ধরে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছিল, ২০২০ সালে সামগ্রিকভাবে স্বর্ণের বৈশ্বিক চাহিদায় মন্দা পড়তে পারে।

ডব্লিউজিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) স্বর্ণ অলংকারের বৈশ্বিক উৎপাদন চাহিদা কমে ৩২৫ দশমিক ৮ টনে নেমেছে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৩৯ শতাংশ কম। একই সঙ্গে তা গত এক দশকের মধ্যে পণ্যটির সর্বনিম্ন ব্যবহারের হার।

এদিকে এ সময়ে স্বর্ণবার ও কয়েনের বিক্রি কমে ২৪১ দশমিক ৬ টনে নেমেছে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৬ শতাংশ কম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও এ সময়ে পণ্যটির ক্রয় কমিয়ে দিয়েছে। ডব্লিউজিসির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ ক্রয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ শতাংশ কমে ১৪৫ টনে নেমেছে। এছাড়া এ সময়ে ইলেকট্রনিকস, বিভিন্ন শিল্প খাত ও দন্ত চিকিৎসার মতো সেক্টরগুলোতে মূল্যবান ধাতুটির ব্যবহার কমে ৭৩ দশমিক ৪ টনে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ শতাংশ কম।

তবে এ সময়ে বিনিয়োগ খাতে ধাতুটির চাহিদা রেকর্ড ছাড়িয়েছে। স্বর্ণকে বলা হয় সেফ হ্যাভেন। যে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা আপত্কালে পণ্যটি বরাবরই বিনিয়োগকারীদের শীর্ষ পছন্দ। এবারো তার ব্যত্যয় হয়নি। নভেল করোনাভাইরাস প্রকোপের মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা যত গভীর হয়েছে, বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণে বিনিয়োগের পরিমাণ তত বাড়িয়েছেন। এতে পণ্যটির চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়ে দাম রেকর্ড বাড়িয়ে তুলেছিল। এ বছর ধাতুটির আউন্স ১ হাজার ৭০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। গত আট বছরের মধ্যে এটাই পণ্যটির সর্বোচ্চ দাম। যা-ই হোক, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে বিনিয়োগকারীদের হাতে স্বর্ণের মজুদ রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ফলে এ সময়ে পণ্যটির বৈশ্বিক চাহিদায় যে মন্দা ভাবের আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা অনেকটা কেটে গেছে। বৈশ্বিক মহামারীকে পাশ কাটিয়ে পণ্যটির বৈশ্বিক চাহিদায় ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।

ডব্লিউজিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের প্রথম প্রান্তিকে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন খাতে স্বর্ণের মোট চাহিদা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৩ টনে। ২০১৯ সালের একই সময়ের তুলনায় মূল্যবান ধাতুটির বৈশ্বিক চাহিদা বেড়েছে ১ শতাংশ।

তবে স্বর্ণের ভবিষ্যৎ কোন দিকে গড়াবে তা বলার জন্য এখন একেবারেই প্রাথমিক সময়। স্বর্ণ অলংকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোতে পণ্যটির চাহিদা আগামী দিনগুলোতেও কমতির দিকেই থাকতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এছাড়া বছরের প্রথমার্ধে চীন ও ভারতে পণ্যটির ব্যবহার ব্যাপক হারে কমে যেতে পারে।