রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি বিপণন কোম্পানিগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড। একসময় দেশের জ্বালানি খাতের প্রায় অর্ধেকই বিপণন করত প্রতিষ্ঠানটি। দেশের এভিয়েশন খাতের জেট ফুয়েলও এককভাবে সরবরাহ হতো এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। তবে অদক্ষতা, অদূরদর্শিতা ও দুর্নীতির কারণে শীর্ষ অবস্থান হারিয়ে এখন রীতিমতো ডুবতে বসেছে পদ্মা অয়েল। এর বিপরীতে জেট ফুয়েল বিপণন না করেও শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে এ খাতের অন্য প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড।

বর্তমানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তিনটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড সারা দেশে জ্বালানি তেল বিপণনের কাজে নিয়োজিত। তিনটি প্রতিষ্ঠানই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সাল পর্যন্ত জ্বালানি তেল বিপণনে শীর্ষ অবস্থানে ছিল পদ্মা অয়েল। ওই সময়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ও তৃতীয় অবস্থানে ছিল মেঘনা পেট্রোলিয়াম। ২০১৭ সালে জ্বালানি বিপণনে প্রথম অবস্থানে চলে আসে যমুনা অয়েল এবং দ্বিতীয় হয় মেঘনা পেট্রোলিয়াম। ২০১৮ সালে মেঘনা পেট্রোলিয়াম প্রথম অবস্থানে চলে আসে। সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরেও শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে (জেট-১, এসবিপি, এমটিটি ব্যতীত) মেঘনা পেট্রোলিয়াম।

বিপিসি জানিয়েছে, একসময় পদ্মা অয়েলের শীর্ষ অবস্থানে থাকার পেছনে ভূমিকা ছিল জেট ফুয়েল সরবরাহ। বিপণন দক্ষতার বিচারে দীর্ঘদিন ধরে দেশের জ্বালানি খাতের অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে একমাত্র পদ্মা অয়েল কোম্পানিই রাষ্ট্রায়ত্ত ও দেশী-বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর সরবরাহকারী ছিল। বর্তমানে প্রতি বছর গড়ে চার লাখ টনেরও বেশি জেট ফুয়েল সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া পদ্মা অয়েল কোম্পানি এককভাবে সলভেন্ট বয়েলিং পয়েন্ট (এসবিপি) ও মিনারেল তারপেটাইন অয়েল (এমটিটি) বিপণন করে। জেট ফুয়েলসহ তিনটি জ্বালানি পণ্য বিপণনে একক আধিপত্য সত্ত্বেও পদ্মা অয়েলের বাজার হিস্যা কমছে।

তিন বিপণন কোম্পানির সর্বশেষ কয়েক বছরের জ্বালানি বিপণনের তুলনামূলক চিত্রে দেখা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মেঘনা পেট্রোলিয়াম জ্বালানি বিপণন করেছে ২০ লাখ ৭৫ হাজার ৬৪৬ টন, যমুনা অয়েল ১৬ লাখ ৬৪ হাজার ৩৯০ টন এবং পদ্মা অয়েল বিপণন করেছে ১৯ লাখ ৮৯ হাজার ২০৫ টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মেঘনা ২৪ লাখ ৬৭ হাজার ১৯৮ টন, যমুনা ১৮ লাখ ৩৫ হাজার ৬৯৫ টন এবং পদ্মা ২৩ লাখ ৭৬ হাজার ৯১৪ টন জ্বালানি সরবরাহ করেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মেঘনা বিক্রি করেছে ২৩ লাখ ৬৫ হাজার ৯৩১ টন, যমুনা ১৭ লাখ ৪৫ হাজার ৯৮৩ টন এবং পদ্মা বিক্রি করেছে ২২ লাখ ৬৬ হাজার ৯০১ টন জ্বালানি তেল। করোনাকালীন সময়সহ ২০১৯-২০ অর্থবছরে মেঘনা বিক্রি করেছে ১০ লাখ ৬৮ হাজার ১৭০ টন, যমুনা ৭ লাখ ৯০ হাজার ৩৮৩ টন এবং পদ্মা অয়েল জ্বালানি বিক্রি করেছে ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৬০৩ টন।

তবে চলতি অর্থবছরে পরিস্থিতি বদলে গেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) মেঘনা পেট্রোলিয়াম পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৬ হাজার ৬৮৪ টন জ্বালানি বেশি সরবরাহ করেছে। অন্যদিকে যমুনা অয়েল কোম্পানি এ সময়ে ৫৯ হাজার ৮৪৯ টন জ্বালানি বেশি সরবরাহ করেছে। তবে অন্য দুই প্রতিষ্ঠানের বাড়লেও একই সময়ে পদ্মা অয়েলের জ্বালানি সরবরাহ আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ৬৮ হাজার ৭৯৫ টন।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অদক্ষতা, অদূরদর্শিতা ও দুর্নীতির কারণে ডুবতে বসেছে পদ্মা অয়েল। বর্তমানে পদ্মা অয়েলের লোকবল, পরিচালন ব্যয় অন্য দুই কোম্পানির তুলনায় অনেক বেশি। পদ্মা অয়েল কোম্পানির স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১ হাজার ২০ জন। প্রয়োজনের তুলনায় এ সংখ্যা ঢের বেশি। যমুনা অয়েল কোম্পানির স্থায়ী লোকবল ৫৩০ এবং মেঘনা অয়েল কোম্পানির স্থায়ী লোকবল রয়েছে মাত্র ৪১০ জন। ফলে পদ্মা অয়েলের পরিচলন ব্যয় বাবদ বাড়তি অর্থ গুনতে হয়।

পদ্মা অয়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ অনেক। অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগ, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অভাব, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জেট ফুয়েল হাইড্রেন্ট লাইন নির্মাণে দুর্নীতি, বিভিন্ন ডিপোতে ভবন নির্মাণকাজে দুর্নীতির কারণে নাজুক পরিস্থিতি পার করছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে। এসব কারণে ২০১৯ সালের শেষার্ধে দেশী-বিদেশী একাধিক এয়ারলাইনসকে টানা কয়েক দিন জেট ফুয়েল সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয় পদ্মা অয়েল, যা ওই সময় কোম্পানির সুনামকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

তবে বাজারে পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি মানতে নারাজ পদ্মা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাসুদুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, জেট ফুয়েল বিশেষায়িত জ্বালানি হওয়ায় পদ্মা অয়েলের অবকাঠামোগত ব্যয় বেশি। বাড়তি লোকবল পরিচালন ব্যয়ও বাড়িয়েছে। করোনাকালে জেট ফুয়েল বিপণন অর্ধেকে নেমে আসায় পদ্মা অয়েল কোম্পানির জ্বালানি বিপণনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এটা সাময়িক। মহামারী পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কোম্পানির বেচাকেনা ও আয়ে প্রবৃদ্ধি ফিরবে।

এদিকে জ্বালানি ও লুব্রিক্যান্টস বিক্রি বাড়ানো, প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাস, কনভারশন ক্ষতি হ্রাসের মাধ্যমে মেঘনা পেট্রোলিয়াম শীর্ষে উঠে এসেছে বলে মনে করছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মেঘনা পেট্রোলিয়াম সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে ১২৪ দশমিক ৩ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৬৩ দশমিক ৯৫ কোটি টাকা। এ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাওয়ার্ড ইন পাবলিক সেক্টর ক্যাটাগরি অর্জন এবং জ্বালানি খাতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবে ট্যাক্স কার্ডে সম্মানিত হয়েছে মেঘনা পেট্রোলিয়াম।

২০২০ সালের শুরুর দিকে করোনাকালীন বৈশ্বিক বাণিজ্য মন্দা সত্ত্বেও মেঘনা পেট্রোলিয়াম ২০১৯-২০ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৩০৭ দশমিক ৯১ কোটি টাকা কর-পূর্ব মুনাফা অর্জন করেছে। এ বাবদ মেঘনা পেট্রোলিয়াম সরকারি কোষাগারে ১০২ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা জমা দিয়েছে, যা দেশের তিন জ্বালানি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এ বিষয়ে মেঘনা পেট্রোলিয়াম কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর ছাইফুল্লাহ-আল-খালেদ বণিক বার্তাকে বলেন, কয়েক বছর ধরে মেঘনা পেট্রোলিয়াম জ্বালানি বিপণনে ঈর্ষণীয় পর্যায়ে রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ছয়-সাত মাসেও জ্বালানি তেল বিক্রিতে প্রায় এক লাখ টন প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে। মূলত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন আনতে পারায় ব্যবসায় ভালো করছে মেঘনা পেট্রোলিয়াম। আগামীতে এ ধারা অব্যাহত রাখতে মেঘনা পেট্রোলিয়াম বিভিন্ন উদ্যোগ এগিয়ে নেবে। এর মধ্য দিয়ে দেশের বাজারে জ্বালানি সরবরাহে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের হিস্যা বর্তমানের তুলনায় আরো বাড়ানো সম্ভব হবে।