চলমান ইরান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও মূল্যবান ধাতুটির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সাধারণত যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংকটের সময়ে স্বর্ণের দাম হুহু করে বাড়ে। ধারণাটি এবার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কৌশলী অবস্থান, সাধারণ ক্রেতাদের আচরণের পরিবর্তন এবং এশিয়ার বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের ব্যবসার গতিপ্রকৃতি নতুন রূপ নিচ্ছে। খবর দ্য ন্যাশনাল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ছিল প্রায় ৫ হাজার ২৭৮ ডলার। যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহ দাম স্থিতিশীল থাকলেও পরবর্তী সময়ে বাজার সম্পূর্ণ উল্টো দিকে মোড় নেয়। এক পর্যায়ে মূল্যবান ধাতুটির দাম ২০ শতাংশের বেশি কমে যায়। সপ্তাহ শেষে ১ দশমিক ৫২ শতাংশ বেড়ে সর্বশেষ ৪ হাজার ১৭৫ ডলার শূন্য ৭ সেন্টে লেনদেন হলেও সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণ ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দার পর সবচেয়ে বড় মাসিক দরপতনের রেকর্ড গড়েছে। অথচ এর ঠিক আগেই জানুয়ারিতে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫৯৫ ডলারে পৌঁছেছিল।
বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ডলারের দুর্বল বিনিময় হারের সময় স্বর্ণের দাম বাড়ে। তবে সুদহার বেশি ও ডলার শক্তিশালী থাকলে এটি প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না। স্বল্পমেয়াদে স্বর্ণকে নগদ অর্থ ও সরকারি বন্ডের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করতে হয়। চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে যখন মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা ও বন্ডের মুনাফা বা ইল্ড বেড়ে যায়, তখন বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের বদলে মার্কিন ট্রেজারি সিকিউরিটিজ বা বন্ডের দিকে ঝোঁকেন। কারণ বন্ড থেকে নিশ্চিত মুনাফা পাওয়া গেলেও স্বর্ণ থেকে কোনো নিয়মিত লভ্যাংশ বা সুদ আসে না। ফলে সুদহীন স্বর্ণ ধরে রাখার খরচ ও প্রবণতা দুই-ই কমে যায়।
তবে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল তাদের মধ্যমেয়াদি প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দাম কমলেও বিগত এক বছরের তুলনায় স্বর্ণ এখনো অন্যতম সেরা পারফরমিং সম্পদ হিসেবে টিকে রয়েছে। কাউন্সিল উল্লেখ করে, অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে বা বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক ধাক্কা লাগলে স্বর্ণের বাজারে আবার সুবাতাস বইতে পারে। তখন দাম আবার আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৫০০ ডলারে উঠে যেতে পারে। অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতি সচল ও সুদহার বেশি থাকলে দাম আরো কমতে পারে। তখন অবশ্য কম দামে স্বর্ণ কেনার জন্য নতুন ক্রেতাদের ভিড় বাড়বে, যা বাজারকে একদম ধসে পড়া থেকে রক্ষা করবে।
বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণকে আর জরুরি মুহূর্তের তাৎক্ষণিক সম্পদ মনে না করে বরং এটিকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত রিজার্ভ হিসেবে দেখছে। তারা এটিকে এক ধরনের আর্থিক বীমা হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে উদীয়মান দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং যেকোনো দেশের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সরাসরি স্বর্ণ কেনার দিকে বেশি ঝুঁকছে।
একই সঙ্গে স্বর্ণের ভৌত চাহিদার একটি বড় অংশ এখন চীন, ভারতের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তর হচ্ছে। মার্কিন ও ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণকে স্বল্পমেয়াদি ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে এশিয়ার পরিবার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো একে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় এবং রিজার্ভের সুরক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করছে। যেমন চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক টানা ১৯ মাস ধরে স্বর্ণের মজুদ ও আমদানি ব্যাপক হারে বাড়িয়েছে। ফলে পশ্চিমা দেশগুলো স্বর্ণের দৈনিক দাম নির্ধারণ করলেও এশিয়ার বাজার ধাতুটির দীর্ঘমেয়াদি দরপতন ঠেকিয়ে রাখছে।









