নতুন একটি প্রযুক্তি বাজারে তুমুল জনপ্রিয় করতে সরকার কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, এটা বুঝতে হলে আপনাকে বেইজিংয়ের রাস্তার দিকে নজর বুলালেই হবে। মাত্র পাঁচ বছর আগে শহরটির কর্তৃপক্ষ জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহূত গাড়ি বন্ধের পরিকল্পনা করেছিল। আজ শহরটির রাস্তায় অবিরাম গতিতে ছুটে চলছে হাজার হাজার বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি।

আরেকটি ব্যাপার হলো, এসব গাড়ির চালককে চার্জিং স্টেশনে সময়ক্ষেপণ করার চিন্তাও করতে হয় না। বেইজিংসহ দেশটির বিভিন্ন শহরের অসংখ্য বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির জন্য ব্যবস্থা আছে সুবিধা মতো ব্যাটারি পাল্টানোর স্টেশন। এসব স্টেশনে গাড়িগুলোর চার্জ শেষ হয়ে যাওয়া ব্যাটারি বদলে কয়েক মিনিটের মধ্যে পূর্ণ চার্জযুক্ত ব্যাটারি সংযুক্ত করে দেয়া হয়। দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে মূল্যবান সময় খোয়ানো থেকে রেহাই মেলে।

চলতি বছরের শুরুর দিকের বিক্রি বিশ্লেষণ করে চীন প্যাসেঞ্জার কার অ্যাসোসিয়েশন (সিপিসিএ) পূর্বাভাস দিয়েছিল যে, চলতি বছর ৫০ লাখের বেশি বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি বিক্রি হতে পারে। তবে গত জুলাইয়ে পুনরায় পর্যালোচনা করে সংস্থাটি বলছে, বিক্রির এ পরিমাণ ৬০ লাখ ছাড়াবে।

বিবিসিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা শুধু সেপ্টেম্বরেই চীনের বাজারে ৮৩ হাজার ১৩৫টি গাড়ি বিক্রি করেছে।

চীনের এক-তৃতীয়াংশ গাড়ি বর্তমানে বিদ্যুচ্চালিত কিংবা হাইব্রিড (ব্যাটারি ও গ্যাস উভয়ই ব্যবহূত হয় এমন) প্রকৃতির। এর অর্থ হলো, দেশটি এখন নতুন এ প্রযুক্তির ব্যবহারে ইউরোপ ও আমেরিকাকে পেছনে ফেলেছে। বিশ্বব্যাপী বিক্রি হওয়া বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির অর্ধেকই এখন বিক্রি হয় চীনে।

নতুন প্রযুক্তির এ গাড়ি নিয়ে চীনে এমন হইচই পড়ে যাওয়ার পেছনে দেশটির সরকারের প্রশংসনীয় পদক্ষেপ এবং নীতিনির্ধারণ অত্যন্ত ফলপ্রসূই হয়েছে বলে মনে করেন অধ্যাপক সিয়েহ। এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশটির সরকার বিদ্যুচ্চালিত গাড়িতে ভর্তুকি দেয়াসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে, যা চলবে ২০২৩ সাল পর্যন্ত। তবে সরকারের এ উদ্যোগ প্রচণ্ডভাবে কাজে লাগায় এ ভর্তুকি এখন আর তেমন প্রভাব ফেলছে না। বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি কেনার ব্যাপারে এখন দ্বিতীয়বার ভাবছে না দেশটির নাগরিকরা।

বর্তমানে চীনের বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রীত ও জনপ্রিয় বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি হলো হং গুয়াং মিনি। মডেলটির এন্ট্রি-লেভেলের একটি গাড়ি কেনা যাবে মাত্র ৪ হাজার ৮০ ডলারে। তবে বিভিন্ন দামে ভিন্ন ভিন্ন ফিচারের উচ্চমূল্যের গাড়ি বেছে নেয়ারও সুযোগ পাচ্ছেন ক্রেতারা। চীনের বাজারে সর্বোচ্চ বিক্রি হওয়া ১০টি গাড়ির মধ্যে টেসলার মডেল ওয়াইয়ের মূল্য ৪৭ হাজার ৬০৯ ডলার এবং এক্সপেং কোম্পানির পি৭ গাড়িটির মূল্য ২৯ হাজার ৫৪৬ ডলার।

রয়টার্স সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, চীনে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির বাজার অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে। অসংখ্য কোম্পানি এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করছে। চীনের জুনিয়াও এয়ারও সম্প্রতি বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি নির্মাণের ইচ্ছা প্রকাশ করে। তবে নতুন প্রযুক্তির এ প্রবল জনপ্রিয়তার মাঝেও মোটা দাগে দুটি প্রশ্ন জাগছে। প্রথমটি হলো, এ ধারা কি অব্যাহত থাকবে? আর দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, বৈশ্বিক বাজারে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির অবস্থান, গতি-প্রকৃতি কেমন হবে! এত জনপ্রিয়তা কত দিন ধরে রাখতে সক্ষম হবে।

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স বিভাগের শিল্প বিশ্লেষণের পরিচালক আনা নিকোলস বলেছেন, চীনে ইদানীং বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি বিক্রির জন্য যে পরিমাণ হুলুস্থুল তৈরি হয়েছে তা সরকারের নতুন গাড়ি ক্রয়ে ভর্তুকি বন্ধের পর কমে যেতে পারে। তিনি আরো বলেন, এ প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কতটা সম্প্রসারিত হবে এবং কতটা ধারাবাহিকতা রাখতে পারবে তা বলা মুশকিল।