ইরানে সামরিক হামলা দীর্ঘায়িত হলেও এটিকে এখনো ‘যুদ্ধ’ বলতে নারাজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি প্রায়ই প্রকাশ্যে মন্তব্য করছেন, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতকে পূর্ণাঙ্গ কোনো যুদ্ধের মর্যাদা দেয়া যায় না। তিনি এ পরিস্থিতিকে সামরিক তৎপরতা বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘এটি একেবারেই একটি ‘ছোট ঘটনা’ বা ‘সামান্য বিষয়’। খবর ফরচুন।
তবে হোয়াইট হাউজ কিংবা ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টি যত সহজভাবে দেখানোর চেষ্টা করুক না কেন, বাস্তবের হিসাব ভিন্ন কথা বলছে।
খাতা-কলমের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজকোষ থেকে এ সামরিক লড়াইয়ের পেছনে এরই মধ্যে বিশাল অংকের অর্থ খসে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষ বাজেটবিষয়ক ওয়াচডগ কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস (সিবিও) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানায়, গত ১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানের বিপক্ষে চলমান সামরিক অভিযানে পেন্টাগন বা মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আনুমানিক মোট খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি বা ৩৮ বিলিয়ন ডলার। প্রতি মাসে এ সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হচ্ছে আনুমানিক ৩ বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি ডলার।
সুবিশাল অংকের অর্থের সিংহভাগই যায় যুদ্ধ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত গোলাবারুদ নতুন করে সংগ্রহ করা ও যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত বা বিনষ্ট হওয়া বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনের কাজে। এছাড়া সামরিক উড়োজাহাজগুলোর অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনা করা, সামরিক যানবাহনে জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি ও আনুষঙ্গিক নানাবিধ অপারেশনের পেছনেও অর্থ ব্যয় করতে হয়।
সিবিওর তথ্যানুযায়ী, এটি কেবল সরাসরি যুক্ত হওয়া খরচ। যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মিত সামরিক বাজেটের অংশ, যেমন সেনাসদস্যদের দৈনন্দিন সুযোগ-সুবিধা কিংবা স্বাভাবিক পরিচালনা ব্যয়কে এ হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে। এমনকি এর বাইরে ফেডারেল সরকারের অন্য দপ্তরগুলো, যেমন ডাক বিভাগসহ বিভিন্ন সংস্থার জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির যে বাড়তি মাশুল গুনতে হচ্ছে, তা-ও সিবিওর এ প্রাথমিক তথ্যে যুক্ত করা হয়নি।
আগস্টের পর থেকে খরচের পরিধি যে আরো বেড়েছে। সিবিও সতর্কবার্তা দিয়ে বলছে, সংঘাত যদি আরো বেশকিছু দিন ধরে চলতে থাকে, তবে বাজেটের ওপর থেকে চাপের মাত্রা কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। সংঘর্ষের মাত্রা যদি মে বা জুনের মতো তুলনামূলক নিচু মাত্রায় বজায় থাকে, তাহলেও মাসে পেন্টাগনের খরচ হবে গড়ে ২০০ কোটি (২ বিলিয়ন) ডলার। জুলাইয়ের মতো কোনো কারণে যদি সংঘর্ষের মাত্রা ও উত্তেজনা আবার চরম সীমানায় পৌঁছে যায়, তবে প্রতি মাসে মার্কিন কোষাগার থেকে খসে যাবে অন্তত ৩০০ কোটি ডলার।
প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ গত জুলাইয়ে এক বক্তব্যে জানান, এ যুদ্ধে তখন পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার খরচ হয়েছে। এদিকে চলতি সপ্তাহে সংবাদপত্র দ্য হিলের প্রতিবেদনে প্রকাশ পায়, পেন্টাগন মার্কিন কংগ্রেসকে দেয়া সর্বশেষ আপডেটে বলেছে, যুদ্ধের সামগ্রিক ব্যয় এরই মধ্যে ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারে পৌঁছে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতির মাঠে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ওপর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাবকে যথাসম্ভব ছোট করে দেখাতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। সম্প্রতি ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের একটি বক্তব্যে সুর মিলিয়ে ট্রাম্প সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘অনেকেই হয়তো একে যুদ্ধ বলতে চান, কিন্তু আমি একে স্রেফ একটি সামরিক সংঘাত মনে করি। কারণ আমাদের জন্য এ সংঘাত খুবই সামান্য বিষয় বা “স্মল পটেটোস’’, এটা তেমন কোনো বড় বিষয়ই নয়।’"
ট্রাম্প তার মন্তব্যের পক্ষে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরে বলেন, ‘এ লড়াইয়ে এ পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনাসদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। অতীতে ইরাক বা আফগানিস্তান যুদ্ধের মতো বড় সামরিক অভিযানের প্রাণহানির তুলনায় সংখ্যাটি বেশ কম।’
এছাড়া ইরানে মার্কিন বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলাগুলো ধারাবাহিক নয়, বরং বিরতি দিয়ে বা নির্দিষ্ট বিরতিতে পরিচালিত হচ্ছে।
সিবিও জানায়, ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধের তুলনায় এখানে যুক্তরাষ্ট্রের সীমিতসংখ্যক সেনা প্রত্যক্ষ লড়াইয়ে জড়িত রয়েছে। কিন্তু এ সংঘাত কেবল যুদ্ধের ময়দানে সীমাবদ্ধ নেই, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সাধারণ মার্কিন পরিবারসহ পুরো বিশ্বের ওপরও এর সরাসরি ও বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।
এর আগে খ্যাতনামা ক্রেডিট রেটিং ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান মুডি’স এক মূল্যায়নে সতর্ক করে জানিয়েছিল, ইরানের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ মার্কিন অর্থনীতি ও সাধারণ ভোক্তাদের জন্য মোট ১০ হাজার কোটি ডলারের সমপরিমাণ বাড়তি খরচের বোঝা তৈরি করেছে। যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি সাধারণ পরিবারের হিসাব ভাঙলে দাঁড়ায় গড়ে প্রায় ৭৫০ মার্কিন ডলার।
মুডি’স অ্যানালিটিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জ্যান্ডির মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে। সেই সঙ্গে সামরিক বাজেটে অতিরিক্ত তহবিল ঢালার কারণে যে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে, তার সিংহভাগই শেষ পর্যন্ত সাধারণ পরিবারের কাঁধে চড়া মূল্যে এসে চেপে বসছে। ফলে রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টিকে যত হালকাভাবেই উপস্থাপন করতে চাক না কেন, অর্থনীতিবিদ ও মার্কিন করদাতাদসহ পুরো বিশ্বের জন্য এটি কোনো সাধারণ ব্যাপার নয়।










