এছাড়া এ সময়ে ২০২৫ সালের চেয়ে ৮২ লাখ ১২ হাজার কেজি বা ৩৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ বাড়তি চায়ের কারণে চলতি বছর ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে বাগান মালিক ও সরকারি নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। মূলত নিলামে চায়ের দাম বৃদ্ধি ও অনুকূল আবহাওয়ায় উৎপাদনে বড় অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করছেন চা-সংশ্লিষ্টরা।

চা বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশের ১৭২টি বাগান ও ক্ষুদ্রায়তন চা চাষী মিলে উৎপাদন করেছিলেন ২ কোটি ২৪ লাখ ১৯ হাজার কেজি চা। একই সময়ে ২০২৪ সালে উৎপাদন হয়েছিল ২ কোটি ৪৩ লাখ ৫ হাজার কেজি। ফলে চলতি বছরের প্রথমার্ধে ২০২৪ সালের তুলনায় উৎপাদন বেড়েছে ৬৩ লাখ ২৬ হাজার কেজি বা ২৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের জুনের উৎপাদন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে। চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও বছরের প্রথমার্ধে গত দুই বছরের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে খাতটি। নিলামে চায়ের চাহিদা বেশি থাকা, মূল্যস্তর দুই দফা নির্ধারণের পাশাপাশি চলতি মৌসুমে আবারো মূল্যস্তর সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া চায়ের নিলাম বাজার ছাড়াও উৎপাদনও চাঙ্গা বলে জানিয়েছেন চা খাতের বিনিয়োগকারীরা।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ২০২৬ সালে চা উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ৭৩ হাজার কেজি। এ সময়ে ২০২৫ সালে উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ৯ হাজার এবং ২০২৪ সালে ১ লাখ ৭৫ হাজার কেজি। ফেব্রুয়ারিতে চলতি বছর উৎপাদন কিছুটা কমে ২৪ হাজার কেজিতে নেমে আসে। এ মাসে ২০২৫ ও ২০২৪ সালে উৎপাদন ছিল যথাক্রমে ৩০ হাজার ও ৪২ হাজার কেজি।

এরপর মার্চ থেকে উৎপাদনে বড় ধরনের গতি আসে। চলতি বছরের মার্চে চা উৎপাদন হয় ২৫ লাখ ৫৮ হাজার কেজি, যেখানে ২০২৫ সালে ১৩ লাখ ৩৫ হাজার ও ২০২৪ সালে ১৫ লাখ ৯৩ হাজার কেজি উৎপাদন হয়েছিল। এপ্রিলেও প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে। চলতি বছরের এপ্রিলে ৫৯ লাখ ১৮ হাজার কেজি উৎপাদনের বিপরীতে ২০২৫ সালে ২২ লাখ ৭২ হাজার এবং ২০২৪ সালে ৪৮ লাখ ৮২ হাজার কেজি উৎপাদন হয়েছিল।

চলতি বছরের মে মাসে উৎপাদন হয়েছে ৯১ লাখ ৫৩ হাজার কেজি। ২০২৫ সালের মে মাসে উৎপাদন ছিল ৮৬ লাখ ৪৮ হাজার ও ২০২৪ সালে ৪৭ লাখ ৭৫ হাজার কেজি। জুনে ১ কোটি ২৪ লাখ ৫ হাজার কেজি চা উৎপাদনের বিপরীতে ২০২৪ সালের জুনে উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ২৮ লাখ ৩৭ হাজার কেজি ও ২০২৫ সালে একই সময়ে উৎপাদন হয়েছিল ৯৮ লাখ ২৫ হাজার কেজি চা।

চলতি বছরের শুরুতে অনুকূল আবহাওয়া, চায়ের ভালো দাম ও নিলামে চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বাগান মালিকদের উৎপাদনে আগ্রহ বাড়ার বিষয়টি সামনে আসে। বছরের প্রথম চার মাসেই উৎপাদন ৯০ লাখ ৭৩ হাজার কেজিতে পৌঁছেছিল, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩০ শতাংশ বেশি ছিল।

চা বোর্ড চলতি বছর দেশে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। জুন পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ। গত দুই বছরে চা খাত উৎপাদন ঘাটতি ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপের মধ্যে থাকলেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে চা খাতের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, দুই বছর ধরে দেশের নিলামে চায়ের ন্যূনতম মূল্যস্তর ঠিক করে দেয়ার কারণে ধারাবাহিকভাবে দাম বাড়তে থাকে। চলতি বছরও ফ্লোরপ্রাইজ বা মূল্যস্তর সংশোধনের জন্য উৎপাদক, ক্রেতা ও ট্রেডার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। যার কারণে মৌসুমের প্রথম নিলাম থেকেই চায়ের চাহিদা ও দাম চাঙ্গা রয়েছে। প্রধান নিলাম কেন্দ্র চট্টগ্রামে সর্বশেষ নিলাম পর্যন্ত প্রতি কেজি চায়ের গড় দাম (শুল্কবিহীন) ২৮০ টাকার বেশি ছিল। তাছাড়া প্রায় প্রতিটি নিলামে ৯০-৯৫ শতাংশ চা-ই কিনে নিচ্ছে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। যার প্রভাবে বাগানগুলোও সর্বোচ্চ পরিমাণ চা পাঠাতে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বাগানসংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশীয় চা সংসদের সভাপতি কামরান তানভিরুর ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চায়ের নিলামে ভালো দাম পেলে বাগানগুলোও বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াতে কাজ করবে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের চা উৎপাদন খরচের সঙ্গে নিলামে বিক্রির দামের পার্থক্য ছিল অনেক বেশি। সরকার উৎপাদকদের কথা বিবেচনায় নিয়ে মূল্যস্তর বসানোর পরিপ্রেক্ষিতে দাম কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে।’ এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে পর্যাপ্ত আমদানির সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন তিনি।

এদিকে দেশের তিন নিলাম বাজারেও প্রতি কেজি চায়ের দাম বিগত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ দামে লেনদেন হচ্ছে। প্রধান নিলাম বাজার চট্টগ্রামের প্রতিটি নিলামে শতভাগের কাছাকাছি চা বিক্রি ছাড়াও চায়ের কেজিপ্রতি গড় মূল্য ৩০০ টাকা ছাড়িয়েছে। চট্টগ্রামের ১০ আগস্টের ১৫তম নিলামে ২২ লাখ ৯৬ হাজার ১৪০ কেজি বিক্রি হয়েছে ২৯৯ দশমিক ৬৩ টাকা গড় দামে। অন্যদিকে ১২ আগস্টের শ্রীমঙ্গলের ১৫তম নিলামে ৫৯ হাজার ৭২৭ কেজি চা ২৭৭ দশমিক ৯১ টাকা গড় দামে বিক্রি হয়েছে। এছাড়া একসময় মৌসুমে পঞ্চগড়ের বটলীফ চা কেজিপ্রতি ১২০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি হলেও সর্বশেষ ১১ আগস্টের ৯ নম্বর নিলামে ৬ হাজার ৭৫২ কেজি কেজিপ্রতি ২৬৬ দশমিক ৩২ টাকা গড় দামে বিক্রি হয়েছে। নিলামে চাহিদা ও মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাগানগুলো পর্যাপ্ত চা উৎপাদনে এগিয়ে এসেছে। এক্ষেত্রে চলতি মৌসুমের পর্যাপ্ত ও পরিমিত বৃষ্টিপাত চায়ের উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে বলে জানিয়েছেন চা-সংশ্লিষ্টরা।