ইসরায়েল ও গাজার সংঘাত শুরুর ছয় মাস অতিবাহিত হলেও শিগগিরই থামার কোনো লক্ষণ নেই। শুরু থেকে এ সংঘাত মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা (এমইএনএ) অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অস্থিতিশীলতা সামনের দিকে আরো বৃহত্তর রূপ ধারণ করতে পারে। এরই মধ্যে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘাতে তার প্রমাণ মিলেছে। একই অনিশ্চয়তার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেখা গেল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে। খবর দ্য ন্যাশনাল।

দুই সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ অঞ্চল আরো একটি বছর নিম্ন প্রবৃদ্ধি দেখবে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক চলতি বছরে অঞ্চলটির জন্য ২ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে, যা গত বছরের প্রবৃদ্ধির তুলনায় কিছুটা বেশি।

এ বিষয়ে আইএমএফের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাবিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক জিহাদ আজর বলেছেন, ‘২০২৪ সালে এ অঞ্চলে অনিশ্চয়তার মাত্রা অন্য যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি।’

তিনি বলেন, ‘এমইএনএর অর্থনৈতিক সংশোধিত পূর্বাভাসে অক্টোবরের আঞ্চলিক আউটলুক থেকে দশমিক ৬ শতাংশ কমিয়ে আনা হয়েছে। এর দুটি প্রধান দিক রয়েছে। একদিকে রয়েছে যুদ্ধের কেন্দ্রস্থল এবং প্রতিবেশী দেশ লেবানন, জর্ডান, মিসর ও ইরাক। অন্যদিকে রয়েছে এর বাণিজ্যিক প্রভাব।’

তবে ২০২৫ সাল নিয়ে আইএমএফের পূর্বাভাস অনেকটা আশাবাদী। তথ্যানুযায়ী, আগামী বছর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হারে বাড়তে পারে।

যুদ্ধের প্রভাবে গত বছর এ অঞ্চলের উদীয়মান অর্থনীতি ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো পর্যটন এবং খাদ্য আমদানি ও পণ্যের ঘাটতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেক দেশ ইউক্রেন ও গাজা দুই যুদ্ধে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্তব্য জিহাদ আজরের।

সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘাতকে নতুন আশঙ্কা হিসেবে উল্লেখ করেন জিহাদ আজর। তার মতে, যেভাবে আঞ্চলিকভাবে ঝুঁকি বাড়ছে তাকে ‘চরম অনিশ্চয়তা’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ রবার্টা গ্যাটির মতে, ‘অনিশ্চয়তা শুধু অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসে সীমিত নয়। বরং এটি সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। এ অনিশ্চয়তা সবকিছুকে আরো কঠিন ও জটিল করে তুলছে।’

বিশ্বব্যাংক আগেই জানিয়েছিল, যুদ্ধের কারণে গাজায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এটি সমগ্র অঞ্চলের জন্য প্রধান ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সতর্ক করে বলেছে, সংঘর্ষ আরো বাড়লে বা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাণিজ্য ও সমুদ্র পথে পণ্য পরিবহন আরো ব্যাহত হতে পারে এবং পর্যটন কমে যাবে। এরই মধ্যে লোহিত সাগরে হুতি হামলার কারণে সুয়েজ খাল থেকে মিসরে আয় ৫০ শতাংশের মতো কমে গেছে। শুধু ডিসেম্বরের শেষ থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে এ রুটে বাণিজ্যের পরিমাণ ৪২ শতাংশ কমেছে। 

এদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বেশির ভাগ দেশে মূল্যস্ফীতি রেকর্ড উচ্চতায় রয়েছে। সামগ্রিকভাবে চলতি বছরের জন্য ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে, যা গত বছরের ১৬ শতাংশ থেকে কিছুটা কম। এর সঙ্গে আইএমএফ ২০২৫ সালের জন্য ১২ দশমিক ৪ শতাংশে পূর্বাভাস দিয়েছে।

এখনই দেশগুলোকে সংকট নিয়ে মনোযোগ দেয়া উচিত বলে মনে করেন জিহাদ আজর। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে আর্থিক বিকল্পগুলো খুঁজতে হবে, যাতে যেকোনো ধাক্কা এড়ানো যায়। এর মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, অর্থায়নের ঝুঁকি হ্রাস ও প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলার মাত্রা বাড়াতে যাবে।’