বিশ্ববাজারে বাড়ছে পাম অয়েলের চাহিদা। সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেলের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী পণ্যগুলোর তুলনায় দাম কমে যাওয়ায় ভোক্তা দেশগুলো পাম অয়েল আমদানি ও ব্যবহার বাড়াচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য তেলের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও পাম অয়েলের চাহিদা বৃদ্ধিতে রসদ জোগাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। খবর রয়টার্স।

ইউক্রেন বিশ্বের শীর্ষ সূর্যমুখী তেল উৎপাদক। দেশটি মূলত কৃষ্ণ সাগরীয় বন্দর ব্যবহার করেই এসব তেল রফতানি করে। কিন্তু গত বছর রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর এসব বন্দর দিয়ে দেশটির রফতানি বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় সূর্যমুখী তেল রফতানিও। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে কৃষ্ণ সাগরীয় খাদ্যশস্য চুক্তি স্বাক্ষর হলে আবারো রফতানি শুরু হয়। সম্প্রতি রাশিয়া চুক্তিটি থেকে বের হয়ে আসায় এটি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে সূর্যমুখী তেল সরবরাহ। ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠছে এটির বাজার।

সয়াবিন তেল উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দেশ। এল নিনো ও শুষ্ক আবহাওয়ায় দেশটিতে সয়াবিন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ঘাটতিতে পড়ছে এটির বৈশ্বিক সরবরাহ। এমন বাস্তবতায় দামও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে।

সূর্যমুখী ও সয়াবিন তেলের সংকুচিত সরবরাহ ও ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণে ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে পাম অয়েল। ক্রমবর্ধমান এ চাহিদা ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার জন্য আশীর্বাদ। এ সুযোগে দেশ দুটি পাম অয়েলের মজুদ কমিয়ে আনতে সক্ষম হচ্ছে। ফিউচার মার্কেটে বাড়ছে মালয়েশিয়ান পাম অয়েলের দাম। 

ভারতের শীর্ষ পাম অয়েল ক্রেতা পতঞ্জলি ফুড লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জীব আস্থানা বলেন, ‘‌অন্যান্য তেলের ব্যাপক মূল্য বৃদ্ধি পাম অয়েলের বাজারকে চাঙ্গা হয়ে উঠতে সহায়তা করছে। দামের সুবিধা নিতে ক্রেতারা পাম অয়েলের প্রতি ঝুঁকছেন।’

ভারত বিশ্বের শীর্ষ ভোজ্যতেল আমদানিকারক। জুলাইয়ে দেশটি ১০ লাখ ৯০ হাজার টন পাম অয়েল আমদানি করে, যা জুনের তুলনায় ৬০ শতাংশেরও বেশি এবং সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরেও ভারতের আমদানি ঊর্ধ্বমুখী থাকবে।

ডিলাররা জানান, সেপ্টেম্বরে ভারতে সরবরাহের জন্য ব্যয়, বীমা ও জাহাজ ভাড়াসহ (সিআইএফ) প্রতি টন অপরিশোধিত পাম অয়েল ৯১০ ডলারে প্রস্তাব করা হচ্ছে। উল্টোদিকে অপরিশোধিত সূর্যমুখী তেলের দাম ১ হাজার ৫০ ডলার ও অপরিশোধিত সয়াবিন তেল ১ হাজার ১০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।

নয়াদিল্লিভিত্তিক এক ডিলার জানান, যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন এবং আর্জেন্টিনার রফতানি কমে যাওয়ার আশঙ্কায় গত মাসে সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে যায়। অন্যদিকে, রাশিয়া কৃষ্ণ সাগরীয় খাদ্যশস্য চুক্তি থেকে বের হয়ে আসায় ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে সূর্যমুখী তেলও।

বিশ্বজুড়ে যে পরিমাণ সূর্যমুখী তেল উৎপাদন হয়, তার ৬০ শতাংশই আসে কৃষ্ণ সাগরীয় অঞ্চল থেকে। পণ্যটির রফতানিতে এ অঞ্চলের অবদান ৭৬ শতাংশ। ডিলাররা বলছেন, চাহিদা বাড়লেও পাম অয়েলের দাম বাড়ছে না। উৎপাদক দেশগুলোয় ব্যাপক মজুদের কারণে উল্টো দাম কমতির দিকে।

সরবরাহ পেতে কম সময় এবং কম খরচের কারণে এশিয়ার মূল্যসংবেদনশীল ক্রেতারা পাম অয়েলের ওপর নির্ভরশীল। ভারত, চীন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের জন্য পণ্যটির আমদানি বাড়াচ্ছে বলে জানিয়েছেন মুম্বাইভিত্তিক ব্যবসায়ীরা।

জুলাইয়ে চীনের ভোজ্যতেল আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৮ শতাংশ বেড়েছে। আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৭৮ হাজার টনে। এর মধ্যে বেশির ভাগই পাম অয়েল।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাম অয়েলের রফতানি বাড়ছে। ফলে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় পণ্যটির মজুদ শিগগিরই কমে আসবে। এতে অন্যান্য ভোজ্যতেলের সঙ্গে পাম অয়েলের দামের ব্যবধানও কমে আসবে।

মালয়েশিয়ান পাম অয়েল বোর্ডের দেয়া তথ্যমতে, জুলাইয়ে মালয়েশিয়ার পাম অয়েল রফতানি ১৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেড়েছে। রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টনে।