যুক্তরাজ্যের মূল্যস্ফীতি রেকর্ড উচ্চতায় রয়ে গিয়েছে। আগস্টে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়ার চাপ কিছুটা ধীর হয়েছিল। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকারও আশা করেছিলেন অর্থনীতিবিদরা। তবে সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি আবারো দুই অংকের ঘরে উন্নীত হয়েছে। ১৯৮০ সালের পরে খাদ্যের দামের সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন গত মাসে ব্রিটিশ মূল্যস্ফীতিকে রেকর্ড উচ্চতায় ঠেলে দিয়েছে। ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের পর থেকেই জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা চলছে। এ পরিস্থিতি জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সংকটে পড়া পরিবারগুলোকে আরো বিপর্যয়ে ফেলে দিয়েছে।
অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে বার্ষিক ভোক্তা মূল্য সূচক (সিপিআই) ১০ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। এর আগে জুলাইয়েও এটি একই হারে বেড়েছিল। মাঝে আগস্টে এটি কিছুটা ধীর হয়ে ৯ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছিল। রয়টার্সের জরিপে অর্থনীতিবিদরা আগস্টে সিপিআই ৯ দশমিক ৯ শতাংশ বাড়ার পর গত মাসে ১০ শতাংশে উন্নীতের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
মূল্যস্ফীতির চাপ পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার খবরে গতকাল ডলারের বিপরীতে পাউন্ডের দাম দশমিক ২ শতাংশ কমে গিয়েছে। এ পরিসংখ্যান ব্রিটিশ পরিবারগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি আরো কঠোর হওয়ার চিত্র তুলে ধরেছে। বিশেষ করে প্রকৃত আয় কমে গিয়ে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। পাশাপাশি সম্প্রতি তারা সরকারের ইউটার্নের পর আর্থিক প্রণোদনা নিয়েও অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হয়েছে। এ তথ্য আগামী মাসে সুদের হার বৃদ্ধি করতে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ওপরও চাপ বাড়ছে।
গত মাসে খাদ্য ও অ্যালকোহলের বাইরে পানীয়গুলোর দাম সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চালক ছিল। কারণ এসব পণ্যের দাম বাড়ার হার ছিল ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এ হার ১৯৮০ সালের এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ। সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাদ দিয়ে হিসাব করা কোর মূল্যস্ফীতিও ক্রমবর্ধমান রয়েছে। গত মাসে কোর মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এ হার দেশটির ইতিহাসে গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অর্থনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ পল ডেলস বলেন, সর্বশেষ তথ্য সেই বিপদকে তুলে ধরেছে যে অর্থনীতি দুর্বল হওয়ার পরেও মূল্যস্ফীতির চাপ রেকর্ড উচ্চতায় রয়ে যায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মন্দার ঝুঁকির মধ্যেও আগ্রাসীভাবে সুদের হার বাড়াচ্ছে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড। কিন্তু এটি নিয়ন্ত্রণে আসার পরিবর্তে রেকর্ড উচ্চতায় উন্নীত হচ্ছে।
পেশাদার পরিষেবা নেটওয়ার্ক কেপিএমজি ইউকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইয়ায়েল সেলফিন বলেন, পারিবারিক বাজেটের ওপর চলমান চাপ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সম্ভবত চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ব্রিটিশ অর্থনীতি প্রযুক্তিগত মন্দার মুখোমুখি হবে।
সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, আগস্টে যুক্তরাজ্যের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আগের মাসের তুলনায় দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। রয়টার্সের জরিপে অর্থনীতিবিদরা আগস্টে জিডিপি শূন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। জুলাইয়ের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানও সংশোধন করে দশমিক ২ শতাংশ কমিয়ে দশমিক ১ শতাংশ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে আগস্টে শেষ হওয়া তিন মাসে দেশটির জিডিপি দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।
এর আগে আগামী বছরের শুরুতে দেশটির মূল্যস্ফীতি ১৮ শতাংশে উন্নীত হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সিটিগ্রুপ। মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংকটি জনিয়েছে, ২০২৩ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) সিপিআই ১৮ শতাংশে পৌঁছবে। এছাড়া ব্যাংক অব ইংল্যান্ড চলতি বছরের শেষ নাগাদ মূল্যস্ফীতি ১৩ শতাংশে পৌঁছার পূর্বাভাস দিয়েছে। যখন থিংকট্যাংক রেজল্যুশন ফাউন্ডেশন পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৩ সালের প্রথম দিকে মূল্যস্ফীতি ১৫ শতাংশে পৌঁছতে পারে। সর্বশেষ দেশটির মূল্যস্ফীতি ১৮ শতাংশে পৌঁছেছিল ১৯৭৬ সালে। সে সময় জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে সংকট বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থবিরতা সৃষ্টি করেছিল।










