বিশ্বজুড়ে বাড়ছে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) চাহিদা। কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামাতে ক্রমবর্ধমান চাপে ইভিতে ঝুঁকছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। এ অবস্থায় ইভি ও ব্যাটারিতে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। ২০৩০ সাল নাগাদ ১ লাখ ২০ হাজার কোটি (ট্রিলিয়ন) ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে শীর্ষ গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। এ বিনিয়োগের মধ্যে ব্যাটারি ও কাঁচামাল ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে এ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে রয়টার্স।
ইভি বিনিয়োগের এ পরিসংখ্যান মাত্র এক বছর আগের পরিকল্পনার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ২০৩০ সাল নাগাদ ৫ কোটি ৪০ লাখ ইভি তৈরির পূর্বাভাস দিয়েছে। এ সংখ্যা মোট যানবাহন উৎপাদনের ৫০ শতাংশেরও বেশি।
ইভি ব্যাটারির বিশ্লেষণ সরবরাহ করা বেঞ্চমার্ক মিনারেল ইন্টেলিজেন্স ও নির্মাতাদের তথ্য অনুসারে, বিপুলসংখ্যক ইভি তৈরিতে সহায়তা করার জন্য গাড়ি নির্মাতা ও তাদের ব্যাটারি অংশীদাররাও আগ্রাসী পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সংস্থাগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ দশমিক ৮ টেরাওয়াট-ঘণ্টা ব্যাটারি উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে চায়।
বিশ্বব্যাপী ইভি উৎপাদনে নেতৃত্ব দিচ্ছে মার্কিন নির্মাতা টেসলা। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী ইলোন মাস্ক ২০৩০ সালের মধ্যে দুই কোটি ইউনিট ইভি তৈরির একটি সাহসী পরিকল্পনার রূপরেখা দিয়েছেন। বিপুলসংখ্যক এ গাড়ি উৎপাদনে আনুমানিক ৩ টেরাওয়াট-ঘণ্টা ব্যাটারির প্রয়োজন হবে। এর আগে ইলোন মাস্ক বলেছিলেন, টেসলা এরই মধ্যে একটি ছোট গাড়ি নিয়ে কাজ করছে। গাড়িটির দাম মডেল থ্রি ও মডেল ওয়াইয়ের অর্ধেক হবে।
এদিকে প্রতিষ্ঠানটি অতিরিক্ত গাড়ি উৎপাদন ব্যয়ের পরিকল্পনা পুরোপুরি প্রকাশ করেনি। সংস্থাটি গাড়ি সরবরাহে ৫০ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে টেসলা জানিয়েছিল, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় গাড়ি বিক্রি ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। কভিডজনিত লকডাউনে চীনে প্রতিষ্ঠানটির বিশাল কারখানা বন্ধের মুখে পড়ার কারণে বিক্রির গতি কমে যায়। তৃতীয় প্রান্তিকে সংস্থাটি ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৮৩০ ইউনিট গাড়ি বিক্রি করেছে। যেখানে এপ্রিল-জুন সময়ে সংস্থাটির বিক্রীত গাড়ির সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫৪ হাজার ৬৯৫ ইউনিট। পাশাপাশি চলতি বছরের এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ৯ লাখ ৮ হাজার ৫৭৩ ইউনিট গাড়ি সরবরাহ করেছে। গত বছর সংস্থাটির সরবরাহকৃত গাড়ির সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ৩৬ হাজার ইউনিট। গাড়ি সরবরাহে ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চলতি বছর সংস্থাটিকে প্রায় ১৪ লাখ গাড়ি সরবরাহ করতে হবে। সে হিসাবে বছরের শেষ তিন মাসে সংস্থাটিকে সরবরাহ করতে হবে ৪ লাখ ৯০ হাজার ইউনিট।
টেসলার চেয়ে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও জার্মানির ফক্সওয়াগন চলতি দশকের শেষ দিকে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ইভি সরবরাহে সংস্থাটি ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় নতুন ব্যাটারি গিগাফ্যাক্টরি যুক্ত করতে চায়। এ লক্ষ্যে সংস্থাটি ১০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। সংখ্যার হিসাবে বিশ্বের শীর্ষ গাড়ি নির্মাতা টয়োটা ইভি ও ব্যাটারি উৎপাদনে ৭ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। চলতি দশকের মধ্যে সংস্থাটি অন্তত ৩৫ লাখ ইউনিট ইভি বিক্রির আশা করছে। এ সময়ের মধ্যে সংস্থাটি তার লেক্সাস ব্র্যান্ডকে পুরোপুরি বিদ্যুচ্চালিত করে তুলতে চায়।
এছাড়া ইভি ব্যয়ের মাত্রা বাড়িয়েছে মার্কিন গাড়ি নির্মাতা ফোর্ডও। সংস্থাটি ৫ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এর মাধ্যমে অংশীদারদের সঙ্গে মিলে ব্যাটারি উৎপাদন সক্ষমতা অন্তত ২৪০ গিগাওয়াট-ঘণ্টায় উন্নীত এবং প্রায় ৩০ লাখ ইভি উৎপাদনের লক্ষ্য সংস্থাটির।
এর বাইরে মার্সিডিজ বেঞ্জ ইভি ডেভেলপমেন্ট ও উৎপাদনের জন্য কমপক্ষে ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলার বরাদ্দ করেছে। জার্মান গাড়ি নির্মাতা অংশীদারদের সঙ্গে বৈশ্বিক ব্যাটারি সক্ষমতা ২০০ গিগাওয়াট-ঘণ্টায় উন্নীত করতে চায়। বিএমডব্লিউ, স্টেলান্টিস ও জেনারেল মোটরসও ইভি ও ব্যাটারি উৎপাদনে কমপক্ষে ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলার করে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ব্যাটারি উৎপাদন পরিকল্পনা নিয়েছে স্টেলান্টিস। ২০৩০ সালের মধ্যে অংশীদারদের সঙ্গে মিলে উত্তর আমেরিকায় চারটি কারখানাসহ ব্যাটারি সক্ষমতা ৪০০ গিগাওয়াট-ঘণ্টায় উন্নীত করার লক্ষ্য নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সংস্থাটির।










