এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বেশিরভাগ শেয়ারবাজার সূচকে গতকাল ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) আবারো সুদহার কমানোর সম্ভাবনা এবং বিভিন্ন দেশের আর্থিক নীতিসংশ্লিষ্ট পদক্ষেপ এবং তথ্য ও প্রতিবেদন এক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। এছাড়া গতকাল ইউরোপেও অধিকাংশ শেয়ার সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী। তবে ওয়াল স্ট্রিটে গতকাল স্বাভাবিক লেনদেন শুরু হওয়ার আগে সেখানকার ফিউচার সূচকগুলো ছিল মিশ্র প্রবণতায়। খবর এপি।

ব্যাংক অব জাপান (বিওজে) গতকাল ঋণের সুদহার দশমিক ২৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে দেশটিতে সুদহার উঠে এসেছে দশমিক ৭৫ শতাংশে, যা ১৯৯৫ সালের পর সর্বোচ্চ। এদিন টোকিওর নিক্কেই ২২৫ সূচক বেড়েছে ১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

জাপানে ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ড এখন ২ শতাংশ ছাড়িয়ে ২০০৬ সালের মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। একই সঙ্গে ডলারের বিপরীতে আরো অবমূল্যায়ন হয়েছে ইয়েনের। এ অবস্থায় দেশটিতে সুদহার বাড়ানোর প্রত্যাশা করছিলেন অনেকেই।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা বিওজের এ পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তাই বাজার এ সিদ্ধান্তকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের বিশ্লেষক অভিজিৎ সুরিয়া বলেন, ‘জাপানে শুক্রবারের (গতকালের) বৈঠকে সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা আগেই স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল। তাই এটি কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা নয়। আর্থিক বাজারগুলো আগেই সুদহারের এ ঊর্ধ্বগতিকে মূল্যায়ন করে রেখেছে।’

বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ অর্থনীতি চীনের মূল ভূখণ্ডের সাংহাই কম্পোজিট সূচক গতকাল দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক বেড়েছে দশমিক ৮ শতাংশ।

এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য অন্যান্য অর্থনীতির মধ্যে ভারতে গতকাল বিএসই সেনসেক্স সূচক বেড়েছে দশমিক ৫৩ শতাংশ। দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক। থাইল্যান্ড এসইটি সূচক বেড়েছে দশমিক ১৭ শতাংশ। ভিয়েতনামের হ্যানয় স্টক এক্সচেঞ্জে এইচএনএক্স ৩০ ইনডেক্স বেড়েছে দশমিক ৬৮ শতাংশ। পাকিস্তানে করাচি স্টক এক্সচেঞ্জে কেএসই ১০০ সূচক বেড়েছে দশমিক ৯৭ শতাংশ।

অস্ট্রেলিয়ায় এসঅ্যান্ডপি এএসএক্স অল অর্ড ইনডেক্স বেড়েছে দশমিক ৪৮ শতাংশ। তবে এশিয়া-প্যাসিফিকে গতকাল সবচেয়ে বেশি ঊর্ধ্বমুখী ছিল মালয়েশিয়ার এফটিএসই বুরসা মালয়েশিয়া ইনডেক্স। সূচকটি বেড়েছে ১ দশমিক ১৫ শতাংশ।

নিম্নমুখী ছিল কেবল জাকার্তা ও ম্যানিলার শেয়ারবাজার। এর মধ্যে জাকার্তার জেএসএক্স কম্পোজিট ইনডেক্সের পতন হয়েছে দশমিক ১ শতাংশ। ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ পতনের দেখা পেয়েছেন ফিলিপাইনের পিএসইআই সূচক।

এশিয়ার শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার বড় একটি কারণ হলো ফেডের আরো সুদহার কমানোর প্রত্যাশা। যুক্তরাষ্ট্রে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরে দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসের তুলনায় কম। মার্কিন কর্মসংস্থান বাজারে শ্লথতার প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতির এমন তথ্য ফেডকে সুদহার আরো কমানোর সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকদের অনেকেই।

তবে পর্যবেক্ষকদের আরেক অংশ মনে করছেন, মার্কিন মূল্যস্ফীতি সম্পর্কিত প্রতিবেদন ফেডের পদক্ষেপে তেমন বড় প্রভাব নাও ফেলতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন ফেডারেল সরকারের ৪৩ দিনের শাটডাউন-পরবর্তী অর্থনৈতিক প্রতিবেদনগুলো ছিল বিশৃঙ্খলাপূর্ণ। ফেডের নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষেত্রে এ বিশৃঙ্খলা বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। শাটডাউনের কারণে অক্টোবরের ভোক্তা মূল্য ও মূল্যস্ফীতির পূর্ণ পরিসংখ্যানও তৈরি করতে পারেনি মার্কিন শ্রম বিভাগ। তবে চলতি মাসের মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদন থেকে মার্কিন অর্থনীতির চিত্র আরো স্পষ্টভাবে জানা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ওয়াল স্ট্রিটে গতকাল এ প্রতিবেদন লেখার সময়ও ওয়াল স্ট্রিটে সাপ্তাহিক লেনদেনের শেষ দিনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়নি। তবে এ সময় ফিউচার সূচকগুলোর মধ্যে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার বেড়েছে দশমিক ১ শতাংশ। আবার আরেক গুরুত্বপূর্ণ সূচক ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ কমেছে দশমিক ২ শতাংশ।

ইউরোপেও গতকাল বেশির ভাগ শেয়ারবাজার সূচকে বৃহস্পতিবারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকতে দেখা গেছে। এর মধ্যে জার্মানির ডয়েশে বোর্স ইনডেক্স বেড়েছে দশমিক ২২ শতাংশ। ফ্রান্সে সিএসি ৪০ সূচক বেড়েছে দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। মাদ্রিদ স্টক এক্সচেঞ্জে আইবেক্স ৩৫ কম্পোজিট ইনডেক্স ও মাদ্রিদ এসই ইনডেক্স বেড়েছে যথাক্রমে দশমিক শূন্য ৩ ও দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। লন্ডনে এফটিএসই ১০০ সূচক বেড়েছে দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।

এর আগে বৃহস্পতিবার সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তে নেয় ব্যাংক অব ইংল্যান্ড (বিওই)। তবে ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ইসিবি) বৈঠকে সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

ওইদিন (বৃহস্পতিবার) ওয়াল স্ট্রিটে প্রধান প্রধান সব সূচকই ছিল ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায়। এর মধ্যে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক চারদিনের নিম্নমুখী প্রবণতা কাটিয়ে গত বৃহস্পতিবার দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ ও নাসডাক কম্পোজিট বেড়েছে যথাক্রমে দশমিক ১ ও ১ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

বরাবরের মতোই বাজারের ঊর্ধ্বমুখী এ প্রবণতায় বড় ভূমিকা রেখেছে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো। শীর্ষ মেমোরি চিপ নির্মাতা মাইক্রন টেকনোলজি নভেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে প্রত্যাশার তুলনায় ভালো মুনাফা করেছে বলে জানিয়েছে। এ খবর প্রকাশের পর কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ১০ দশমিক ২ শতাংশ। পরবর্তী তিন মাসেও ইতিবাচক আয় ও মুনাফার পূর্বাভাসও দিয়েছে মাইক্রন।

তবে এআই খাত সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে অতিমূল্যায়ন সংক্রান্ত উদ্বেগ এখনো বিরাজ করছে। ব্রডকম ও ওরাকলের শেয়ারদর সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও বৃহস্পতিবার যথাক্রমে ১ দশমিক ১ ও দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে যায়। নাসডাকের সবচেয়ে প্রভাবশালী চিপ কোম্পানি এনভিডিয়া শেয়ারদর বেড়েছে ১ দশমিক ৮ শতাংশ।

এদিন বাজারে সবচেয়ে বেশি লাভবান কোম্পানি ছিল ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপ (টিএমটিজি)। এদিন কোম্পানিটির শেয়ারদর ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। এতে চলতি বছরের শুরু থেকে হওয়া ৬৯ দশমিক ৩ শতাংশ ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে উঠেছে কোম্পানিটি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল প্লাটফর্ম দিয়ে শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অন্যান্য ব্যবসায়ে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করে কোম্পানিটি। বর্তমানে এটি ফিউশন এনার্জিতে প্রবেশ করছে। মূলত টিএই টেকনোলজিসের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত কোম্পানিটির শেয়ারদর বাড়িয়েছে। যেখানে সম্পূর্ণ স্টক ডিলের মাধ্যমে প্রতিটি কোম্পানি সম্মিলিত ব্যবসার প্রায় অর্ধেক অংশের মালিক হবে। ৬০০ কোটি ডলারের চুক্তিটি টিএমটিজির বিনিয়োগ আকর্ষণ সক্ষমতা ও টিএইর প্রযুক্তিকে একত্র করবে।