ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধে বিপর্যস্ত অ্যালুমিনিয়ামের বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন চাঙ্গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে চীন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরে ইউরোপে রফতানি বাড়িয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদক দেশটি। রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ফলে ইউরোপের বিগলনকারী কারখানাগুলোয় সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে। এতে চীনের অ্যালুমিনিয়াম রফতানি বৃদ্ধি ইতিবাচক হিসেবে দেখা দিয়েছে। তবে চীনের অতিরিক্ত রফতানি নিয়ে শঙ্কাও ব্যক্ত করছেন অনেকে। চীনের বিরুদ্ধে নিম্নমানের অ্যালুমিনিয়ামও বাজারে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ তাদের।

রাশিয়ার অ্যালুমিনিয়াম যদিও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েনি, কিন্তু বিপাকে পড়ার কথা জানিয়েছে রুসাল। কাঁচামাল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যার কথা জানিয়েছে রাশিয়ার বৃহত্তম অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি। গত মার্চে রাশিয়ায় আকরিক বক্সাইট ও অন্যান্য কাঁচামাল রফতানি নিষিদ্ধ করে রাশিয়া। এতে কুইন্সল্যান্ড অ্যালুমিনার সঙ্গে রুসালের যে যৌথ উদ্যোগ ছিল তা বিঘ্নিত হয়েছে। সাইবেরিয়ায় রুসালের বিগলন কারখানায় সরবরাহকৃত কাঁচামালের ২০ শতাংশ আসত অস্ট্রেলিয়া থেকে।

রাশিয়া যখন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় ধুঁকছে, তখন এগিয়ে এসেছে ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন। ২০২০ ও ২০২১ সালেও রাশিয়ায় চীনের অ্যালুমিনিয়াম রফতানি ছিল নগণ্য। রাশিয়ায় দুই বছরে যথাক্রমে ১ হাজার ২৫৮ ও ১ হাজার ৭৪৭ টন অ্যালুমিনিয়াম রফতানি করেছে চীন। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের পর চার মাসে রাশিয়ায় ৪ লাখ ৭১ হাজার টন অ্যালুমিনিয়াম রফতানি করেছে এশিয়ার শীর্ষ অর্থনীতির দেশটি। এর মধ্যে গত জুনে রেকর্ড সর্বোচ্চ ১ লাখ ৮৪ হাজার টন রফতানি করেছে তারা।

ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে ইউরোপের বাজারে সৃষ্ট শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে আরো অনেক দেশে রফতানি বাড়িয়েছে চীন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পশ্চিমা দেশগুলোয় চীনের অ্যালুমিনিয়াম রফতানি হয়েছে ১ লাখ ৭৭ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে যেখানে রফতানি হয়েছিল মাত্র ৩ হাজার ৮১৫ টন।

প্রথমার্ধে নেদারল্যান্ডসে অ্যালুমিনিয়াম রফতানি হয়েছে ৫৯ হাজার ১০০ টন, তুরস্কে ৩২ হাজার ৯০০ টন, মন্টেনিগ্রোয় ২০ হাজার ১০০ টন, যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ হাজার টন ও ইতালিতে পাঁচ হাজার টন।

১৫ শতাংশ রফতানি শুল্কের কারণে এক দশকে চীনের অ্যালুমিনিয়াম রফতানি ছিল ন্যূনতম। কিন্তু সম্প্রতি বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় উপকরণ সংকট প্রবল হওয়ায় বড় অংকের শুল্ক সত্ত্বেও রফতানি বাড়িয়েছেন চীনা রফতানিকারকরা।

২০২০ সাল নাগাদ বিশ্বের অন্যতম অপরিশোধিত অ্যালুমিনিয়াম আমদানিকারক ছিল চীন। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারি-জুনে চীনের অ্যালুমিনিয়াম আমদানি ৭৫ শতাংশ কমে ১ লাখ ৯৭ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালের একই সময়ে যেখানে আমদানি ছিল ৭ লাখ ৪৪ হাজার টন।

স্থানীয় বাজারে অ্যালুমিনিয়ামের চাহিদা কিছুটা কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারকে লক্ষ্য করে উৎপাদন বাড়িয়ে যাচ্ছে চীন। রফতানির ক্ষেত্রে অপরিশোধিত অ্যালুমিনিয়ামে জোর দিচ্ছে চীন। এতে রফতানি শুল্ক ও ভ্যাট ছাড়ের সুবিধা ঘরে তুলছে তারা। গত বছর চীনের অপরিশোধিত অ্যালুমিনিয়াম রফতানি ১৮ শতাংশ বেড়ে ৫৫ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরে এ কাঁচামাল রফতানি ২৮ শতাংশ বেড়েছে। তবে পশ্চিমা দেশগুলো চীনের এ ডাম্পিং নিয়ে কিছুটা উষ্মাও প্রকাশ করেছে। গত মাসের শুরুতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানায়, নয় মাসের জন্য চীনের অ্যালুমিনিয়ামে যে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছিল সে সুবিধা আর বাড়ানো হচ্ছে না। মেয়াদ শেষ হলে চীনা অ্যালুমিনিয়ামে ১৪-২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।