স্থলসীমান্ত রয়েছে এমন দেশ থেকে আমদানি সীমিতকরণের উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি কিছু নতুন নির্দেশনাও জারি করেছে নয়াদিল্লি। এরই ধারাবাহিকতায় চীনের সঙ্গে সশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন কোম্পানির কাছ থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি বন্ধ করেছে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানিগুলো। খবর রয়টার্স।
চীনের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্ক খুব একটা ভালো যাচ্ছে না ভারতের। বিশেষ করে লাদাখে লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) এলাকায় উত্তেজনা বেড়ে যাওয়া ও দুই দেশের সেনাদের সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা সম্পর্কের তিক্ততা বাড়িয়েছে। এ অবস্থায় নিজেদের শক্তিমত্তা বাড়াতে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আসলে তিনি চীনের ওপর থেকে আমদানিনির্ভরতা কমানোর ওপরই জোর দিয়েছেন।
এরই অংশ হিসেবে গত ২৩ জুলাই নতুন নির্দেশনা জারি করে নয়াদিল্লি। ওই নির্দেশনা জারির পর ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত তেল পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো তাদের আমদানি দরপত্রে নতুন একটি ক্লজ যুক্ত করা শুরু করেছে, যার মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে এমন দেশের কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। বিষয়টিতে ওয়াকিবহাল তিনজন ব্যক্তি এ কথা জানিয়েছেন। এছাড়া দরপত্রের নথিপত্রও একই কথা বলছে।
ওই তিন সূত্রের একজন জানান, গত সপ্তাহে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো সিএনওওসি লিমিটেড, ইউনিপেক ও পেট্রোচায়নার মতো চীনা ট্রেডিং ফার্মের কাছে আমদানির দরপত্র পাঠানো বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
২৩ জুলাইয়ের ওই নির্দেশনা অনুযায়ী ভারতের সীমান্তবর্তী দেশের কোনো কোম্পানি ভারতীয় নিলামে অংশ নিতে চাইলে কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ভারতের সঙ্গে চীন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটানের সীমান্ত রয়েছে। নয়াদিল্লির ওই নির্দেশনায় এসব দেশের মধ্যে কারো নাম নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি।
ভারতের জ্বালানি তেলের ভোক্তাবাজার বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম। দেশটি তার মোট জ্বালানি চাহিদার ৮৪ শতাংশই আমদানি করে। জ্বালানি আমদানির দিক থেকেও ভারতের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়। প্রতিদিন ৫০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে দেশটির। এর ৬০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো।
চীন সরাসরি ভারতে অপরিশোধিত জ্বালানি রফতানি করে না, তবে বিশ্ববাজারে পণ্যটির বাণিজ্যে চীনা কোম্পানিগুলোর আধিপত্য রয়েছে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও আমেরিকার বেশকিছু জ্বালানি ক্ষেত্রে মূলধনি বিনিয়োগ রয়েছে চীনা কোম্পানিগুলোর। ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানিগুলোর জ্বালানি আমদানির দরপত্রেও প্রভাব বিস্তার করতে দেখা গেছে চীনা কোম্পানিগুলোকে।
ওয়াকিবহাল সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো যাদের সঙ্গে চুক্তিতে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে চায়না এভিয়েশন অয়েল (সিঙ্গাপুর), পেট্রোচায়না,
ইউনিপেকের সাবসিডিয়ারি ইত্যাদি। এছাড়া আমদানীকৃত জ্বালানি পরিবহনের জন্য চীনা ট্যাংকার ভাড়া করাও বন্ধ করেছে তারা।
তবে চীনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন কোনো ট্যাংকারে অপরিশোধিত জ্বালানি এলেও ভারত তার ডেলিভারি বুঝে নেবে, যদি সেই আমদানি চুক্তিটি কস্ট, ইন্স্যুরেন্স, ফ্রেইটের (সিআইএফ) ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়ে থাকে। এ ধরনের চুক্তি অনুযায়ী বিক্রেতাই জাহাজের ব্যবস্থা করে।
ভারতের জ্বালানি পরিশোধন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় বেশি রয়েছে। বেশির ভাগ পরিশোধন কোম্পানিকেই তাদের সক্ষমতার চেয়ে কম জ্বালানি পরিশোধন করতে হচ্ছে। বিশেষ করে কভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে জ্বালানির চাহিদা কমে যাওয়ায় তাদের সক্ষমতার উদ্বৃত্তই থেকে যাচ্ছে।
ওয়াকিবহাল ওই তিন ব্যক্তির একজন জানান, ‘বর্তমানে আমাদের জ্বালানির চাহিদা অনেকটাই কম রয়েছে। ফলে নতুন নির্দেশনার কারণে আমাদের ওপর তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। অবশ্য নতুন শর্তের কারণে একসময় হয়তো আমাদের বিপাকে পড়তে হতে পারে। তবে আমাদের জাতীয় স্বার্থের বিষয়টিও দেখতে হবে।’










