একই সঙ্গে বেনাপোলসহ স্থলবন্দরগুলোয় পণ্য হ্যান্ডলিং আরো দ্রুত এবং দক্ষ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন ভারতীয় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন সিআইআইয়ের মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি।

দিনের শুরুতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতীয় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা। এ সময় বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনাকারী ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা, বিনিয়োগের সুযোগ এবং দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে বেনাপোলসহ স্থলবন্দর দিয়ে কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহনের জটিলতা এবং কার্গো হ্যান্ডলিং আরো দ্রুত ও দক্ষ করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা।

বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনাকারী ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্থলবন্দর দিয়ে কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহনে সমস্যার কথা জানিয়েছে। বিশেষ করে বেনাপোল বন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিং আরো দক্ষ করা প্রয়োজন। সীমান্তে পণ্য চলাচল সহজ হলে পরিবহন ও কাঁচামালের ব্যয় কমবে, এতে দুই দেশের বাণিজ্যও বাড়বে।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে প্রস্তাবিত দুটি বিটুবি টাস্কফোর্সের কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয়। টাস্কফোর্স দুটির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে নিতে বড় ধরনের অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রয়োজন। নতুন রেলপথ, মহাসড়ক, বন্দর ও এলএনজি অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল অর্থায়ন দরকার। ভারতীয় বিনিয়োগকারীরা এসব খাতে আগ্রহী হলে এবং তা বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হলে সহযোগিতাকে ইতিবাচকভাবে দেখা হবে।’

পরে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে এফবিসিসিআই ও সিআইআই প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. আব্দুল আউয়াল মিন্টু প্রধান অতিথি ছিলেন। এফবিসিসিআইয়ের পক্ষে নেতৃত্ব দেন প্রশাসক মো. ফজলুল হক।

বৈঠকে শুল্ক ও অশুল্ক বাণিজ্য বাধা দূর করা, ব্যবসা পরিচালনা সহজ করা এবং সরাসরি ব্যবসায়ী টু ব্যবসায়ী যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। উদীয়মান শিল্প খাতে হাইড্রোজেন, সৌরবিদ্যুৎ, বায়োটেকনোলজি, পারমাণবিক জ্বালানি এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর খাতে প্রযুক্তি বিনিময়, যৌথ বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। এসব খাতে দুই দেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।

এছাড়া অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে অংশীদারত্ব তৈরির বিষয়টি আলোচনায় আসে। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ভারতীয় কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো নিয়েও মতবিনিময় করেন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা। এ ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন প্রকল্প গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়।

বৈঠকে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিয়মিত ত্রৈমাসিক বৈঠক এবং বিভিন্ন খাতে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল বিনিময়ের প্রস্তাবও উঠে আসে। বিদ্যমান বাণিজ্য বাধা, বিশেষ করে অশুল্ক বাধা চিহ্নিত ও সমাধানে এফবিসিসিআই ও সিআইআইয়ের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হয়। পাশাপাশি নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের সমস্যা দ্রুত চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হয়।

এফবিসিসিআইয়ের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিআইআইয়ের মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি বলেন, ‘দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে শুধু সরকারি পর্যায়ের যোগাযোগ নয়, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।’ তিনি পিপল টু পিপল এনগেজমেন্ট বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এ সময় ভারত-বাংলাদেশের রাজনৈতিকভাবে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়েও সাংবাদিকদের প্রশ্ন ওঠে। তবে দিনব্যাপী বৈঠকগুলোর মূল আলোচনায় দুই দেশের ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়টিই প্রাধান্য পায়। ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করে নতুন সম্ভাবনাময় খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েই সংশ্লিষ্টরা বেশি গুরুত্ব দেন।

প্রস্তাবিত টাস্কফোর্স দুটির কাঠামো ও কার্যক্রম নিয়ে দ্রুত আরো আলোচনা করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সম্মত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের নিয়মিত যোগাযোগ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং যৌথ উদ্যোগ বাড়ানো গেলে বাংলাদেশ-ভারতের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরো সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।