বৈশ্বিক অর্থনীতির অনেক কিছু নির্ভর করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির ওপর। গত দুই দশকে এসব দেশের প্রবৃদ্ধি ৬-৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এ মন্থরতা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। এটা অব্যাহত থাকলে আগামী দশকে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় প্রতি চারজনের তিনজন তরুণ বেকার হয়ে যাবেন। এ সমস্যা নিরসনে নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এসব দেশে বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চায় সংস্থাটি। খবর রয়টার্স।

মূলত তথ্য ভাগাভাগির মাধ্যমে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আস্থায় আনতে চায় আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাটি। এরই অংশ হিসেবে আগামী সপ্তাহ থেকে ঋণ খেলাপসহ মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করবে বিশ্বব্যাংক। চায়না ডেভেলপমেন্ট ফোরামে অংশ নিয়ে গতকাল এসব কথা বলেছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা। 

ফোরামে বক্তৃতাকালে উদীয়মান অর্থনীতির জন্য বিশ্বব্যাংকের তহবিল সংক্রান্ত তথ্যও জানান তিনি। অজয় বাঙ্গা বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক গ্রুপ উদীয়মান বাজারের জন্য ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার প্রাইভেট ক্যাপিটাল জোগাড় করেছে। গত বছর বন্ড ইস্যু করে বেসরকারি খাত থেকে আরো ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করা হয়েছে।’

উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে বিভিন্ন ধরনের বাধা থাকে। এসব বাধা কাটিয়ে উঠতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এ খাতে উন্নয়নশীল দেশের সমস্যা বিশ্লেষণ করতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, ব্যাংক ও বিভিন্ন সংস্থার ১৫ জন প্রধান নির্বাহীকে সঙ্গে নিয়ে একটি ফোকাস গ্রুপ গঠন করা হয়েছে, যারা সমস্যার বিভিন্ন দিক চিহ্নিত করতে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, রাজনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা সংস্থানের ঝুঁকি থেকে সৃষ্ট উদ্বেগ।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক নয় বলেও জানান অজয় বাঙ্গা। কারণ দুই দশকে দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ৬-৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এ মন্থরতা অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি হারানো শতাংশীয় পয়েন্ট ১০ কোটি মানুষকে দারিদ্র্যের মধ্যে টেনে নিয়ে গেছে। এ সময় বেড়েছে ঋণের মাত্রা।’

উন্নয়নশীল দেশে প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। কারণ এসব দেশে চাকরির বাজারে প্রবেশে সক্ষম তরুণের সংখ্যা আগামী দশকে ১১০ কোটিতে পৌঁছবে। কিন্তু মাত্র ৩২ কোটি ৫০ লাখের জন্য প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান থাকবে। একে ‘একটি অকল্পনীয় ব্যবধান’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

গত ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বব্যাংক একটি সংস্কার কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিল। যার মাধ্যমে ঋণ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে খেলাপি ঝুঁকি নিরসনের উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক গ্যারান্টি (ঝুঁকি তহবিল) তিন গুণ করে ২ হাজার কোটি ডলার করার ঘোষণা দেয় বিশ্বব্যাংক।

চায়না ডেভেলপমেন্ট ফোরামে অজয় বাঙ্গা বলেন, ‘‌ব্যাংক ও উন্নয়ন সংস্থার একটি কনসোর্টিয়াম আয়ের স্তর অনুসারে বেসরকারি খাতের তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে দিতে আগামী সপ্তাহ থেকে এ কার্যক্রম শুরু হবে। যেখানে ১৯৮৫ সাল থেকে সাম্প্রতিক সময়ের বেসরকারি ও সরকারি খাতের খেলাপি ঋণ এবং পুনরুদ্ধারের তথ্য থাকবে।’

অজয় বাঙ্গা জানান, এসব পদক্ষেপের একটিই লক্ষ্য। তা হলো উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে আরো বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।

বিশ্বব্যাংকের আওতায় একটি দীর্ঘমেয়াদি সিকিউরিটাইজেশন প্লাটফর্ম তৈরির প্রচেষ্টা চলছে বলেও জানান মাস্টারকার্ডের সাবেক সিইও অজয় বাঙ্গা। এ প্লাটফর্মের মাধ্যমে পেনশন তহবিল ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ৭০ ট্রিলিয়ন ডলার উদীয়মান বাজারে আনা যাবে।

তার মতে, একটি প্যাকেজে বৃহৎ বিনিয়োগগুলোকে একত্রিত করা গেলে তা অন্যদের উৎসাহিত করবে। এর মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতির ঝুঁকিগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এতে বিশ্বব্যাংকের প্রকাশ করা তথ্য পরিস্থিতি মূল্যায়নে সাহায্য করবে।

এ সময় চীনের অর্থনৈতিক উল্লম্ফনকে অন্য দেশগুলোর সামনে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন অজয় বাঙ্গা। দেশটি পাঁচ দশকে ‘উল্লেখযোগ্য অর্জন’ করেছে বলে জানান তিনি। অজয় বাঙ্গা বলেন, ‘চীন লাখ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, দারিদ্র্য হ্রাস করেছে ও কার্বন নির্গমন হ্রাস করেছে।’ সঙ্গে যোগ করেন, একসময় বিশ্বব্যাংকের প্রধান ঋণগ্রহীতা ছিল চীন। বর্তমানে দেশটি এ সংস্থার অন্যতম বড় দাতা।