করোনা মহামারীর মধ্যে স্বর্ণের বৈশ্বিক বাজারে ভিন্নধর্মী এক চিত্র ফুটে উঠেছে। অর্থনীতির সূত্র অনুযায়ী, কোনো পণ্যের চাহিদা বাড়লে সেটার দামও বেড়ে যায়। তবে বিদায়ী বছরে স্বর্ণের বাজারে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। এ সময় স্বর্ণের বৈশ্বিক চাহিদা কমে ১১ বছরের সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে। তবে মূল্যবান ধাতুটির দাম কমেনি। উল্টো এ সময় দাম বেড়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছুঁয়েছে স্বর্ণ। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাকালে আয় কমে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে অলংকার খাতে স্বর্ণের চাহিদা কম ছিল। এটা মূল্যবান ধাতুটির সামগ্রিক চাহিদা পতনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। তবে বিনিয়োগ হিসেবে বাড়তি চাহিদা বছরজুড়ে স্বর্ণের বাজার চাঙ্গা রেখেছিল। খবর রয়টার্স ও মাইনিংডটকম।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের (ডব্লিউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে স্বর্ণের সম্মিলিত চাহিদা ছিল ৩ হাজার ৭৫৯ দশমিক ৬ টন। এক বছরের ব্যবধানে মূল্যবান ধাতুটির বৈশ্বিক চাহিদা কমেছে ১৪ শতাংশ। এর মধ্য দিয়ে ২০০৯ সালের পর এবারই প্রথম স্বর্ণের বৈশ্বিক চাহিদা চার হাজার টনের নিচে নেমে এসেছে। অর্থাৎ ১১ বছরের মধ্যে মূল্যবান ধাতুটির বৈশ্বিক চাহিদায় এটাই সবচেয়ে বড় পতন।

স্বর্ণের চাহিদা পতনের পেছনে নভেল করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারীকে চিহ্নিত করেছে ডব্লিউজিসি। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, মহামারীতে অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছে। অনেকের বেতন কমেছে। সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব আয়োজন থেকে বিরত রয়েছে অনেক দেশের মানুষ। স্বাভাবিকভাবে চীন ও ভারতে এসব উৎসবে উপহার হিসেবে স্বর্ণালংকার দেয়ার চল থাকায় বাজারে মূল্যবান ধাতুটির চাহিদা ও দাম দুটোই বেড়ে যায়। চাহিদা কমলে কমে দামও। তবে বিদায়ী বছরে চাহিদা কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বেড়েছে।

ডব্লিউজিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে অলংকার শিল্পে স্বর্ণের সম্মিলিত চাহিদা ছিল ১ হাজার ৪১১ দশমিক ৬ টন। এক বছরের ব্যবধানে অলংকার শিল্পে মূল্যবান ধাতুটির চাহিদা ৩৪ শতাংশ কমেছে। একই চিত্র দেখা গেছে প্রযুক্তি খাত ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোয় স্বর্ণের চাহিদায়। ২০২০ সালে দেশে দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোয় স্বর্ণের সম্মিলিত চাহিদা ছিল সাকল্যে ২৭২ দশমিক ৯ টন। এক বছরের ব্যবধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোয় স্বর্ণের সম্মিলিত চাহিদা রেকর্ড ৫৯ শতাংশ কমেছে। বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে গত বছর স্বর্ণের সম্মিলিত চাহিদা ৩০১ দশমিক ৯ টনে দাঁড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছে ডব্লিউজিসি, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ কম।

অলংকার, প্রযুক্তি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক—তিন খাতে গত বছর স্বর্ণের বৈশ্বিক চাহিদায় মন্দা ভাব দেখা গেলেও ব্যতিক্রম ছিল বিনিয়োগ খাত। মহামারীসহ যেকোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে নিরাপদ বিনিয়োগ উৎস বা সেফ হ্যাভেন হিসেবে স্বর্ণের জনপ্রিয়তা বাড়ে। গত বছরও আন্তর্জাতিক বাজারে একই চিত্র দেখা গেছে। ডব্লিউজিসি বলছে, ২০২০ সালে বার ও কয়েন হিসেবে স্বর্ণের বৈশ্বিক চাহিদা দাঁড়িয়েছে ৮৯৬ টনে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ শতাংশ বেশি। একই সময়ে এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড বা ইটিএফ হিসেবে মূল্যবান ধাতুটির বৈশ্বিক চাহিদা আগের বছরের তুলনায় বেড়ে ৮৭৭ দশমিক ১ টনে উন্নীত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছে ডব্লিউজিসি।

প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর বিশ্বজুড়ে অলংকার, প্রযুক্তি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক খাতে স্বর্ণের চাহিদা কমলেও বাড়তির দিকে ছিল বিনিয়োগ (বার, কয়েন ও ইটিএফ) খাতে। মূলত এ কারণে মহামারীকালে সামগ্রিক চাহিদা কমলেও স্বর্ণের দাম রেকর্ড ছুঁয়েছে। বিনিয়োগ হিসেবে বাড়তি চাহিদার জের ধরে গত বছরের আগস্টে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ২ হাজার ৭২ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ইতিহাসে এর আগে কখনই স্বর্ণের দাম এতটা ওঠেনি।