চীনকে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম উৎপাদন কেন্দ্র। বিভিন্ন ধরনের পণ্য থেকে খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদনের জন্য বিশ্বের অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির ওপর নির্ভর করে। তাই উৎপাদন খাত চীনা অর্থনীতির অন্যতম শক্তিও। কিন্তু চীনের আগের প্রজন্ম যেমন দিনের পর দিন যন্ত্রাংশ উৎপাদন কারখানা কিংবা টেক্সটাইল মিলে চাকরি করেই জীবনজীবিকা নির্বাহ করেছে, বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ঠিক এ ধরনের কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, চীনের কর্মশক্তিতে যুক্ত হতে যাওয়া তরুণেরা কম বেতন, দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম এবং আঘাতের ঝুঁকি আছে, এমন কাজগুলোকে প্রত্যাখ্যান করছে রীতিমতো। ক্লান্তিকর এসব কাজের বিপরীতে দোকানে দোকানে পণ্য বিক্রি কিংবা সুপারমার্কেটের জন্য সরবরাহকারকের কাজের প্রতি তারা বেশি আগ্রহী।
২০-৩০ বছর বয়সী তরুণরা কারখানানির্ভর কঠোর পরিশ্রমের কাজের ওপর থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলার কারণে বড় ধরনের শ্রম ঘাটতি তৈরি হচ্ছে দেশটিতে। কেননা বিশ্বব্যাপী ব্যবহূত পণ্যের এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদন হয় চীনে। কিন্তু তরুণ শ্রমশক্তির মুখ ফিরিয়ে নেয়া উৎপাদনশিল্পের জন্য বড় ধরনের শ্রমসংকট তৈরি করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কারখানার মালিকেরা আরো বেশি ও দ্রুত উৎপাদনের দিকে জোর দিচ্ছে। পাশাপাশি কারখানায় বয়স্ক কর্মীর স্থলে তারা তরুণ প্রজন্মকে নিয়োগ দিতে বেশি আগ্রহী। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই তাদের উচ্চ বেতন ও উন্নত কর্মপরিবেশের দিকে জোর দিতে হবে।
তুলনামূলক ছোট ও মাঝারি কারখানা মালিকেরা বলছেন, অটোমেশন প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ খানিকটা অসাধ্য বা অযৌক্তিক, কেননা ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও ঋণের খরচ চীনের মূল রফতানি বাজারে চাহিদা কমিয়ে দিচ্ছে।
সিআইআইসি কনসাল্টিংয়ের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৮০ শতাংশের বেশি চীনা কারখানা চলতি বছর বড় ধরনের শ্রম ঘাটতির সম্মুখীন হয়েছে, যা তাদের কর্মশক্তির ১০-৩০ শতাংশের সমতুল্য। এদিকে চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের মধ্যে উৎপাদন খাতে প্রায় তিন কোটি শ্রমিকের ঘাটতির পূর্বাভাস দিয়েছে, যা অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যার চেয়ে বেশি।
অথচ কাগজে-কলমে দেশটিতে শ্রমশক্তির কোনো অভাব নেই। তথ্যমতে, ১৬-২৪ বছর বয়সী চীনা তরুণদের মধ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ বেকার। তারা শ্রমশক্তির ঘাটতি পূরণে বড় ধরনের অবদান রাখতে পারে। তবে কভিড-১৯ বিধিনিষেধ, আবাসন খাতের মন্দা এবং প্রযুক্তি ও অন্যান্য বেসরকারি শিল্পের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ নীতির ফলে চীনের অর্থনীতি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ধীর প্রবৃদ্ধির মুখোমুখি।
এ অবস্থায় কারখানা মালিকেরা বলছেন, শ্রমশক্তি ও বাজারের অমিল মোকাবেলা করার জন্য তাদের কাছে তিনটি প্রধান বিকল্প রয়েছে। লাভের মার্জিন বলি দিয়ে মজুরি বাড়াতে হবে, অটোমেশনে মনোযোগ বাড়াতে হবে অথবা চীন ও পশ্চিমের মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে সৃষ্টি স্রোতের বিপরীতে গিয়ে ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো সস্তা শ্রমবাজারের দিকে স্থানান্তরিত হতে হবে। কিন্তু প্রত্যেকটি বিকল্পই বাস্তবায়ন করা কঠিন।
যদিও চীনা নীতিনির্ধারকরা বয়স্ক শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরতা কাটানোর সমাধান হিসেবে অটোমেশন ও শিল্প আপগ্রেডিংয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। তবে ১৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশটি জনসংখ্যাগতভাবেও মন্দার দ্বারপ্রান্তে। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবোটিকস বলেছে, ২০২১ সালে চীনে রোবট সংস্থাপন আগের বছরের তুলনায় ৪৪ শতাংশ বেড়েছে।
ফোশান শহরের একটি স্টেইনলেস স্ট্রিল কারখানার মহাব্যবস্থাপক ডটি পণ্য প্যাকিজিং ও কারখানার মেঝে পরিষ্কারের জন্য স্বয়ংক্রিয় বা রোবটের ব্যবহার শুরু করেছেন। তিনি বলেন, প্যাকেজিং বা মেঝে পরিষ্কারের মতো এ ধরনের কাজে অটোমেশন আনা খুব বেশি কঠিন নয়। তবে অন্য কাজের জন্য এ ব্যবস্থা খুব ব্যয়বহুল। সুতরাং উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখতে তরুণ কর্মী থাকা অত্যাবশ্যক। যেমন আমাদের পণ্যগুলো অনেক ভারী এবং একটি প্রক্রিয়া থেকে অন্য প্রক্রিয়ায় পণ্য স্থানান্তর করতে তরুণ জনবলের প্রয়োজন। পাশাপাশি উচ্চ তাপমাত্রার মতো শ্রমসাধ্য কাজে লোকবল নিয়োগ দিতে বেগ পেতে হয়।










