গত সপ্তাহে এশিয়ার স্পট মার্কেটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম এ বছরের মধ্যে রেকর্ড সর্বোচ্চে উঠেছে। তবে শীর্ষ এলএনজি ব্যবহারকারী অঞ্চলটিতে অব্যাহত কমছে। মূলত ইউরোপে রাশিয়ান গ্যাসের তীব্র সংকট এশিয়ায় দুর্বল চাহিদা সত্ত্বেও দাম বাড়াতে সহায়তা করছে।

তথ্য বলছে, গত ২৯ জুলাই প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির স্পট মূল্য ছিল ৪২ ডলার ৫০ সেন্ট। এ বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে এলএনজির দাম। ৪ মার্চ জ্বালানিটির দাম রেকর্ড সর্বোচ্চে ওঠে। প্রতি এমএমবিটিইউর মূল্য দাঁড়ায় ৪০ ডলার ৫০ সেন্টে। তবে গত সপ্তাহে এ রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে এলএনজি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর এশিয়ার বাজারে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ৪৮ ডলার ৩০ সেন্টে উঠেছিল। গত বছরের জন্য এটিই ছিল রেকর্ড সর্বোচ্চ। এ বছরের এখন পর্যন্ত জ্বালানিটির দাম সে পর্যায়ে যায়নি। তবে গত বছরের একই সপ্তাহের (জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ) তুলনায় দাম ১৬০ শতাংশ বেড়েছে। ২০২০ সালের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ১ হাজার ৪০০ শতাংশ।

স্বাভাবিকভাবে চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ার কথা থাকলেও এশিয়ার বাজারে ঘটছে তার উল্টো। সংশ্লিষ্টরা জানান, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এশিয়ায় এলএনজি আমদানি অব্যাহত কমেছে। কিন্তু সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দাম।

পণ্যবাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলার জানায়, এশিয়া অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি ক্রেতা দেশ চীন। জুলাইয়ে দেশটি প্রাথমিকভাবে ৫১ লাখ ২০ হাজার টন এলএনজি ক্রয় করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে হিসাবে আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে।  কেপলারের প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে চীন ৩ কোটি ৬৫ লাখ ৩০ হাজার টন এলএনজি আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ বা ৮৮ লাখ ৯০ হাজার টন কমেছে।

গত বছর জাপানকে পেছনে ফেলে এলএনজি আমদানিতে বিশ্বের শীর্ষে উঠে আসে চীন। তবে এ বছর দেশটি এ অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে জাপানের এলএনজি আমদানিতেও নিম্নমুখী চিত্র দেখা গিয়েছে। তবে আমদানির ক্ষেত্রে দেশটি অবস্থা এখনো চীনের মতো নয়। কেপলারের দেয়া তথ্যমতে, জুলাইয়ে জাপান ৬৭ লাখ ২০ হাজার টন এলএনজি আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি কিছুটা বেড়েছে। তবে এ বছরের প্রথম সাত মাসে আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৪৫ লাখ টনে।

এশিয়ার তৃতীয় বৃহৎ এলএনজি আমদানিকারক দেশ দক্ষিণ কোরিয়া। চলতি বছরের এখন পর্যন্ত এ দেশেও জ্বালানিটির চাহিদায় নিম্নমুখিতা লক্ষ করা গিয়েছে। বছরের প্রথম সাত মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার এলএনজি আমদানি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। জুলাইয়ে আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশ কমেছে।

ভারত এশিয়ার চতুর্থ বৃহৎ এলএনজি আমদানিকারক। জুলাইয়ে দেশটি ১৮ লাখ টন এলএনজি আমদানি করে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। বছরের প্রথম সাত মাসে আমদানি কমে ১ কোটি ২৪ লাখ ৪০ হাজার টনে নেমেছে।

কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, বছরের প্রথম সাত মাসে এশিয়া অঞ্চলে সব মিলিয়ে আমদানি হয়েছে ১৫ কোটি ৪৪ লাখ ৬০ হাজার টন এলএনজি। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি ৬ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে।

জ্বালানি তেলের (আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্ট) মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে এলএনজির যে দাম নির্ধারণ করা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে তা বেড়ে রেকর্ড সর্বোচ্চে উঠেছে। এশিয়ায় জ্বালানিটির চাহিদা কমে যাওয়ার পেছনে এ মূল্যবৃদ্ধিকেই দায়ী করা হচ্ছে।

জ্বালানির চাহিদা মেটাতে চীন কয়লা উত্তোলন বাড়িয়েছে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে জ্বালানিটির ব্যবহার কমানো হয়েছে। অন্যদিকে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া পারমাণবিক ও কয়লার মতো উৎসগুলোকে এলএনজির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছে।