বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হচ্ছে বিদ্যুচ্চালিত যানবাহন (ইভি)। চাহিদা বাড়ায় নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও পরিবেশবান্ধব এ গাড়ি উৎপাদনে জোর দিচ্ছে। এতে চাহিদা বাড়ছে ইভির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ব্যাটারির। সদ্যসমাপ্ত বছরে বৈশ্বিক ইভি ব্যাটারি বাজারে আধিপত্য ধরে রেখেছে চীন। বিশ্বের শীর্ষ ১০ ইভি ব্যাটারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ছয়টিই চীনের। পাশাপাশি বৈশ্বিক ইভি ব্যাটারি বাজারের ৬০ দশমিক ৫ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করছে দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের খবর অনুসারে, চীনের মূল ভূখণ্ডে ইভি বিক্রি দ্বিগুণ হওয়ায় ব্যাটারির চাহিদা বেড়েছে। তবে সংস্থাগুলোর ব্যাটারি উৎপাদন সক্ষমতা শিগগিরই স্থানীয় চাহিদাকে ছাড়িয়ে যাবে। এ অবস্থায় সংস্থাগুলোকে চীনের বাইরে বাজার বিস্তৃত করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএনই রিসার্চের তথ্য অনুসারে, ২০২২ সালেও বিশ্বের বৃহত্তম ইভি ব্যাটারি উৎপাদনকারী হিসেবে পূর্ব চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের কনটেমপোরারি অ্যাম্পেরেক্স টেকনোলজি (সিএটিএল) অবস্থান ধরে রেখেছে। সংস্থাটি গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১৬৫ দশমিক ৭ গিগাওয়াট ঘণ্টা ব্যাটারি সেল উৎপাদন করেছে। এটি ২০২১ সালের একই সময়ের তুলনায় ১০১ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। গত বছর সংস্থাটির বৈশ্বিক বাজার অংশীদারত্ব ৩৭ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০২১ সালেও এ হার ৩২ দশমিক ৮ শতাংশে ছিল।
বিশ্বজুড়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাটারি নির্মাতা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে শেনজেনভিত্তিক ইভি ও ব্যাটারি নির্মাতা বিওয়াইডি। গত বছর সংস্থাটির ব্যাটারি উৎপাদন ১৬৮ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ৬০ দশমিক ৬ গিগাওয়াট ঘণ্টায় পৌঁছেছে। এ সময়ে সংস্থাটির বাজার অংশীদারত্ব ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। যেখানে গত বছর ছিল ৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
বিশেষায়িত গাড়ির ব্যাটারি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সুঝো হ্যাজার্ডটেক্সের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী ডেভিস জ্যাং বলেন, চীনা ইভি ব্যাটারি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন প্রযুক্তি ও বিক্রি উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্বে শীর্ষস্থানীয়। তবে স্থানীয় চাহিদার তুলনায় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বেশি হয়ে গেছে। এজন্য সংস্থাগুলোকে চীনের বাইরে বাজার প্রসারিত করতে হবে।
বিশ্বের শীর্ষ ১০ ইভি ব্যাটারি নির্মাতার মধ্যে বাকি চারটি চীনা প্রতিষ্ঠান হলো সিএএলবি, গোশন হাই-টেক, সানওডা ও ইভ এনার্জি। বৈশ্বিক ইভি ব্যাটারির ৪ শতাংশ বাজার অংশীদারত্ব নিয়ে সিএএলবি সপ্তম স্থানে রয়েছে। অষ্টম স্থানে থাকা গোশন হাই-টেকের বাজার অংশীদারত্ব ছিল ২ দশমিক ৮ শতাংশ। ১ দশমিক ৭ শতাংশ বাজার অংশীদারত্ব নিয়ে নবম সানওডা এবং ১ দশমিক ৩ শতাংশ বাজার অংশীদারত্ব নিয়ে দশম স্থানে রয়েছে ইভ এনার্জি।
চায়না প্যাসেঞ্জার কার অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, চীনে পূর্ণাঙ্গ ইভি ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির বিক্রি ৬৪ লাখ ইউনিট ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ সংখ্যা গত বছরের ২৯ লাখ ৯০ হাজার ইউনিটের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি।
বিশ্বজুড়ে ইভির দুই-তৃতীয়াংশই বিক্রি হয় চীনে। এটি দেশটিকে বিশ্বের বৃহত্তম ইভি বাজার করে তুলেছে। জীবাশ্ম চালিত যাত্রীবাহী গাড়ির ক্ষেত্রেও দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম বাজার। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, ২০২২ সালে বিশ্বজুড়ে ইভি সরবরাহ মোট যাত্রীবাহী গাড়ির ১৩ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করবে। সংখ্যার হিসাবে যা ১ কোটি ইউনিট। সিএটিএল ও বিওয়াইটি টেসলা এবং বিএমডব্লিউর মতো আন্তর্জাতিক গাড়ি নির্মাতাদের ব্যাটারি সরবরাহ করে। সংস্থাটির লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি নিরাপদ, লাভজনক ও উচ্চ কর্মদক্ষতাসম্পন্ন হিসেবে দেখা হয়।
বর্তমানে দুটি প্রযুক্তি এলএফপি (লিথিয়াম, আয়রন ও ফসফেট) এবং এনসিএম (লিথিয়াম, নিকেল, কোবাল্ট ও ম্যাঙ্গানিজ) ইভি ব্যাটারি তৈরিতে বহুল ব্যবহূত হয়। সিএটিএলের এলএফপি ও এনসিএম ব্যাটারিগুলো চীনা ও আন্তর্জাতিক গাড়ি নির্মাতাদের কাছে জনপ্রিয়। এছাড়া বিওয়াইডি ব্লেড এলএফপি ব্যাটারি প্যাক জার্মানির বার্লিনে টেসলার কারখানায় সরবরাহ করে। এ ব্যাটারিগুলো লম্বা ও পাতলাভাবে ডিজাইন করা হয়েছে।
চীনের স্টেট কাউন্সিল নিয়ন্ত্রিত একটি সংবাদপত্র ইকোনমিক ডেইলির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনা ইভি ব্যাটারি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখনই বিশ্বজুড়ে গ্রাহক খুঁজতে হবে। কারণ আগ্রাসী সম্প্রসারণের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা শিগগিরই দেশীয় গাড়ি নির্মাতাদের চাহিদার চেয়ে তিন গুণ বেশি হবে।
প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়েছে, চীনের মূল ভূখণ্ডের ইভি ব্যাটারি নির্মাতাদের উৎপাদন ২০২৫ সাল নাগাদ বার্ষিক প্রায় ৩ হাজার গিগাওয়াট ঘণ্টায় উন্নীত হবে। এটি ওই সময়ে ইভি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রত্যাশিত চাহিদার তুলনায় তিন গুণ। প্রধান ব্যাটারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্মোচন করা সম্প্রসারণ পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে এ বিশ্লেষণ করেছে সংবাদপত্রটি।










