মাত্র আট লাখ জনসংখ্যার দেশ দক্ষিণ আমেরিকার গায়ানা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি বছর দেশটির অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ হবে ৩৮ শতাংশ। ২০২৮ সালের মধ্যে সম্প্রসারণের মাত্রা ১০০ শতাংশ অতিক্রম করবে। আইএমএফ একা নয়, অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিএমআই রিসার্চ মনে করে, লাতিন আমেরিকার দেশটি আগামী দিনে ব্যাপক অর্থনৈতিক উল্লম্ফন দেখবে। আগামী পাঁচ বছরে জিডিপি বাড়বে ১১৫ শতাংশ পর্যন্ত। এর মধ্যেই দেশটি বিশ্বের দ্রুততম সম্প্রসারমাণ অর্থনীতির স্থান দখল করে রেখেছে। আর এ অর্জনের পেছনে প্রধান কারণ জ্বালানি তেল উৎপাদন ও রফতানি খাত। 

গায়ানায় চলতি বছরেই দৈনিক উৎপাদিত তেলের পরিমাণ ৩ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেলে উত্তীর্ণ হবে। ২০২৭ সালের মধ্যে দৈনিক উৎপাদন দাঁড়াবে ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি। জ্বালানি তেল ও গ্যাস উত্তোলনকারী মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সন মবিলের নেতৃত্বে কাজ শুরু করেছে দেশটির নব আবিষ্কৃত স্ট্যাবরক ব্লক। স্ট্যাবরক ব্লক হলো ৬৬ লাখ একরজুড়ে আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলজুড়ে বিস্তৃত জ্বালানি তেলের খনি। এক্সন মবিলের দাবি অনুযায়ী, সেখানে ১ হাজার ১০০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে। 

গায়ানার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা হয়ে উঠছে জ্বালানি তেলের মজুদ। ২০২২ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ। বিশ্বে আর কোনো দেশের জিডিপির হার এত বেশি নয়। জ্বালানি তেল বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশটিতে নতুন তেলক্ষেত্র অনুসন্ধানের কার্যক্রম জারি আছে। সমান অনুপাতে বৃদ্ধি পাচ্ছে তেলবহির্ভূত অন্যান্য খাত। পরিবহন ও আবাসন খাতে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে বিনিয়োগ। দেশটির কৃষি, খনি ও বাণিজ্যিক খাতও প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করছে। বিএমআই রিসার্চের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু ট্রাহান দাবি করেছেন, অন্তত আগামী দুই বছর গায়ানা শীর্ষস্থান দখলে রাখবে।

ক্যারিবীয় অঞ্চলের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর একটি ছিল গায়ানা। অথচ বর্ধিত জ্বালানি তেল রফতানি খাতের প্রভাবে দেশটিতে কর্মসংস্থানের চিত্রও বদলে যাচ্ছে। পরিবর্তন এসেছে সরকারি আয়ে। তবে দেশের রাজনৈতিক অবস্থার কারণে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অর্থনীতিবিদ ভ্যালারি মারসেল বলেছেন, ‘‌সময়ের ব্যবধানে জ্বালানি তেলের মূল্য কমে আসবে। এজন্য আগামী দিনগুলোয় গায়ানার উচিত তার অর্থনীতিকে বহুমাত্রিক বানানো।’ 

তবে গায়ানার জন্য ঝুঁকি যে নেই, তা নয়। বিশেষ করে দুর্নীতি ও মাত্রাতিরিক্ত জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেলে। ১৯৫৯ সালে প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পর নেদারল্যান্ডসের শিল্পোৎপাদন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তার কারণ নেদারল্যান্ডস মাত্রাতিরিক্ত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে পর্যটন ও শিল্পোৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। অর্থনীতিতে বহুমাত্রিকতা বাড়াচ্ছে। অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে টেকসই করার জন্য গায়ানাকে বিষয়গুলো নিয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন ট্রাহান। তিনি বলেছেন, ‘‌আদি ভারতীয়, আফ্রিকান ও গায়ানিজ জনগণের মাধ্যমে বহুধা বিভাজিত গায়ানার ইতিহাস ও সংস্কৃতি। রয়েছে সংঘাত, দুর্নীতি ও অপরাধপ্রবণতার ইতিহাস। জ্বালানি তেলের অর্থ সে বিভাজনকে আরো তীব্র করে তুলতে পারে।’ সিএনবিসি অবলম্বনে