লোহিত সাগরে সৃষ্ট ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় আট সপ্তাহ ধরে পণ্যবাহী জাহাজের ভাড়া বেড়েই চলেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সমুদ্র বাণিজ্য গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড কনটেইনার ইনডেক্সের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদ সংস্থা আনাদোলু।
লোহিত সাগরের বাব-এল-মান্দেব প্রণালিতে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর আক্রমণ করছে বলে দাবি ইরানসমর্থিত ইয়েমেনি সংগঠন হুথিদের। এতে কয়েক ডজন জাহাজ আক্রান্তও হয়েছে। তবে বড় ধরনের ক্ষয়-ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এসব হামলার প্রতিক্রিয়ায় প্রধান শিপিং সংস্থাগুলো বিকল্প পথ হিসেবে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ বেছে নিয়েছে। ঘুরপথে ভ্রমণের জন্য পণ্যবাহী জাহাজকে অতিরিক্ত ১০ দিন থেকে দুই সপ্তাহ সময় নিতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহে হুথিদের বিরুদ্ধে সমুদ্রের পাশাপাশি স্থলভাগে অভিযান শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। তখন আরেক দফা শিপিং সংস্থাগুলোকে সতর্ক করে দেয়া হয়। ওই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে চলাচল না করতে বলা হয়।
ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরকে সংযুক্ত করেছে সুয়েজ খাল। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে নৌযোগাযোগের এ সংক্ষিপ্ততম রুটে মোট বৈশ্বিক বাণিজ্যের ১২ শতাংশ সম্পন্ন হয়। কিন্তু হুথি হামলার পর শিপিং সংস্থাগুলো বেছে নেয় উত্তমাশা অন্তরীপ। এতে এদিকে সরবরাহ চেইন বিলম্বিত হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবহন ভাড়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে নভেম্বর থেকে পরবর্তী মাসে পণ্যবাহী জাহাজে কনটেইনার ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ৪০ ফুট কনটেইনারের ভাড়া গত বছরের ৩০ নভেম্বর ছিল ১ হাজার ৩৮২ ডলার। ২৫ জানুয়ারি নাগাদ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৬৪ ডলার। অর্থাৎ ওয়ার্ল্ড কনটেইনারের সূচক অনুসারে ভাড়া বৃদ্ধির হার ১৮৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
আবার বছরওয়ারি হিসাবে ২৫ জানুয়ারি থেকে ৪০ ফুট কনটেইনারের ভাড়া বৃদ্ধির হার ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশ। সর্বশেষ আট সপ্তাহের নিরিখে সপ্তাহ থেকে সপ্তাহ হিসাবে ৫ শতাংশ করে বেড়েছে। এছাড়া ৪০ ফুট কনটেইনারের স্পট ভাড়া ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। বর্তমানে ভাড়া প্রাক-মহামারী সময়ের গড় থেকে ১৭৯ শতাংশ ওপরে।
একই সময়ে সাংহাই-জেনেভা রুটে সর্বোচ্চ ৩৫৫ দশমিক ৬ শতাংশ, সাংহাই-রটারডাম ৩২৫ দশমিক ৬, সাংহাই-নিউইয়র্ক ১৩৯ দশমিক ৭ ও সাংহাই-লস অ্যাঞ্জেলেস রুটে ১২০ দশমিক ৪ শতাংশসহ পণ্যবাহী কনটেইনারের ভাড়া সর্বোচ্চ বৃদ্ধির রেকর্ড হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড ও অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির পোর্টওয়াচ ডাটাবেস অনুসারে, লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পরিমাণ অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। ২১ জানুয়ারি শেষ হওয়া সপ্তাহে বাব-এল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বছরওয়ারি ৫৯ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে মিসরের সুয়েজ খালে বাণিজ্যের পরিমাণ ৪৪ শতাংশ কমেছে। তবে উত্তমাশা অন্তরীপে বাণিজ্যের পরিমাণ একই সপ্তাহে ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।
লোহিত সাগরে হামলার পর বিশ্বের বৃহত্তম কনটেইনার সংস্থাগুলো এ পথ এড়িয়ে চলার ঘোষণা দেয়। এর মধ্যে ডেনিশ শিপিং কোম্পানি মায়েরস্ক, ইতালিয়ান-সুইস মেডিটেরিয়ান শিপিং কোম্পানি (এমএসসি), জার্মানির হ্যাপাগ-লয়েড, ফরাসি সিএমএ ও ব্রিটিশ জ্বালানি তেল সংস্থা বিপি এ অঞ্চলে কার্যক্রম স্থগিত করে। এছাড়া দক্ষিণ লোহিত সাগরের মাধ্যমে পরিবহন কার্যক্রম স্থগিত করেছে ডেনিশ ট্যাংকার কোম্পানি টর্ম। তাদের অনুসরণ করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক জ্বালানি তেল কোম্পানি শেল।
লোহিত সাগরে চলমান পরিস্থিতির কারণে কাতারের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল সংস্থা কাতারএনার্জি উত্তমাশা অন্তরীপের মাধ্যমে ইউরোপে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি এ ঘোষণার সঙ্গে জানিয়ে দেয়া হয় স্প্যানিশ জ্বালানি সংস্থা এন্ডেসার জন্য পাঠানো এলএনজি চালান পৌঁছতে ১০-১২ দিন দেরি হবে।










