বিশ্বজুড়ে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকি আরো বাড়ার পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের দাম লাগামহীন হয়ে পড়ার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। কৃষ্ণ সাগরীয় খাদ্যশস্য চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় মূলত এ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যার সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়বে দরিদ্র দেশগুলোয়।

খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি বলতে বোঝায় পৃথিবীর বড় একটি অংশে পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া। কৃষ্ণ সাগরীয় খাদ্যশস্য চুক্তির অবসানের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে শস্যের প্রাপ্ত্যতা কমে আসবে, যা স্বাভাবিকভাবে খাদ্যপণ্যের দামকে আরো ঊর্ধ্বমুখী করে তুলবে। ফলে নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের সংস্থান করাই চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়বে।

আইএমএফের এক মুখপাত্র বলেন, ‘‌কৃষ্ণ সাগরীয় চুক্তিটির মেয়াদ না বাড়ায় অনেক দেশেই খাদ্যসরবরাহ খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার যেসব দেশ ইউক্রেনের খাদ্যশস্যের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল, সেসব দেশ সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখ রয়েছে। বিষয়টি খাদ্যনিরাপত্তাকে অনেক বেশি ঝুঁকিতে ফেলছে। বৈশ্বিক খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে ঊর্ধ্বমুখিতার ঝুঁকিও প্রবল হচ্ছে। যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে নিম্ন আয়ের দেশগুলো।’

তিনি বলেন, ‘‌বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার জন্য কৃষ্ণ সাগরীয় চুক্তিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্য ও সার রফতানিতে ইউক্রেনকে ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গত বছর বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এ চুক্তি সে অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতেও সহায়তা করেছে, অর্থাৎ চুক্তিটির পর প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম নিম্নমুখী হয়ে ওঠে।’

এদিকে রাশিয়ার এমন সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বের কোটি কোটি ক্ষুধার্ত মানুষ বিপাকে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। সম্প্রতি তিনি বলেন, ‘‌বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এরই মধ্যে ক্ষুধায় ধুঁকছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে হিমশিম খাচ্ছে। শস্য চুক্তি নিয়ে রাশিয়ার এ সিদ্ধান্তের কারণে আরো মূল্য দিতে হবে এসব মানুষকে।’

রাশিয়া গত বছরের শুরুর দিকে ইউক্রেনে হামলা চালালে বন্ধ হয়ে পড়ে কৃষ্ণ সাগরীয় বন্দর দিয়ে শস্য রফতানি। রুশ সেনাদের অবরোধের মুখে ইউক্রেনের রফতানিকারকরা গমসহ সব ধরনের খাদ্যশস্য রফতানি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। ওই সময় দেশটি স্থল ও রেলপথ দিয়ে অল্প কিছু শস্য রফতানি করতে সক্ষম হয়।

টানা ছয় মাস রফতানি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের সরবরাহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে খাদ্যপণ্যের দাম। নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলো খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তুরস্ক ও জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় গত বছরের জুলাইয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এতে ফের কৃষ্ণ সাগরীয় বন্দর দিয়ে রফতানি চালু হয়।

এরপর কয়েকবার চুক্তিটি নবায়ন করা হয়েছে এবং এর অধীনে ইউক্রেন প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ টন শস্য ও অন্যান্য খাবার সরবরাহ করেছে। তবে এ বছর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার জবাবে চুক্তিটি থেকে বের হয়ে আসার হুমকি দেয় রাশিয়া। অবশেষে সম্প্রতি দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি থেকে বের হয়ে আসে।