২০২২ সালের শুরুতে নতুন মাইলফলক ছুঁয়েছিল অ্যাপল। সে সময় আইফোন নির্মাতার বাজারমূল্য ৩ ট্রিলিয়ন (লাখ কোটি ডলার) ডলারের মাইলফলক ছাড়িয়ে যায়। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রথম কোনো প্রতিষ্ঠান হিসেবে ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্লাবে জায়গা করে নিয়েছিল মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টটি। এর ঠিক এক বছর পরই সংস্থাটি ২ ট্রিলিয়নের ক্লাব থেকেও ছিটকে গেছে।
সিএনএন বিজনেসের খবর অনুসারে, সর্বশেষ গত মঙ্গলবারের লেনদেনে অ্যাপলের বাজারমূল্য ২ লাখ কোটি ডলারের নিচে নেমে গিয়েছে। ২০২১ সালের শুরুর দিকের পর প্রথমবারের মতো সংস্থাটির বাজারমূল্য এত নিচে নামল। এদিন সংস্থাটির শেয়ারদর প্রায় ৪ শতাংশ কমে যায়। বিশ্বজুড়ে সংস্থাটির পণ্যের চাহিদা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করায় পুঁজিবাজারে সংস্থাটির শেয়ারদর নিম্নমুখী হয়।
এর আগে ২০১৮ সালের আগস্টে বিশ্বের প্রথম লাখ কোটি ডলারের কোম্পানি হিসেবেও রেকর্ড গড়েছিল অ্যাপল। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটি ২ লাখ কোটি ডলারের মাইলফলকও পেরিয়ে যায়। এরপর গত বছরের শুরুতে ৩ লাখ কোটি ডলারের মাইলফলক ছুঁয়েছে আইফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি। কভিডজনিত কারণে প্রযুক্তি পণ্যের তুমুল চাহিদা অ্যাপলকে এ মাইলফলকে পৌঁছতে সহায়তা করেছিল।
নিক্কেই এশিয়ার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যাপল সম্প্রতি বেশ কয়েকটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ২০২৩ সালের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) জন্য জনপ্রিয় পণ্যগুলোর যন্ত্রাংশ উৎপাদন কমিয়ে দেয়ার কথা জানিয়েছে। এ পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে এয়ারপডস, অ্যাপল ওয়াচ ও ম্যাকবুক। বিষয়টি নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি আইফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত বছর অন্য প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর মতো অ্যাপলের সরবরাহ ব্যবস্থাও বিঘ্ন ঘটেছে। পাশাপাশি জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার শঙ্কা আইফোনের মতো দামি পণ্যের চাহিদা কমিয়ে দিতে পারে। এ পরিস্থিতি বিজ্ঞাপনদাতা ও ভোক্তাদের ব্যয়ে লাগাম টানতে বাধ্য করছে।
ছুটির কেনাকাটার মৌসুমগুলোয় বিপুল পরিমাণ পণ্য বিক্রি করে অ্যাপল। তবে এবারের বছর শেষের ছুটির মৌসুমি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির দেখা পেয়েছে সংস্থাটি। চীনে কভিডজনিত কারণে সরবরাহকারীরা বাধার মুখে পড়ায় পণ্যের শিপমেন্ট কমে যায়। যদিও সম্প্রতি সেই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে সব মিলিয়ে সংস্থাটির বিক্রি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মহামারীর মধ্যে ২০২০-২১ সালেও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তুমুল চাহিদার মুখোমুখি হয়েছিল। এজন্য সংস্থাগুলোর শেয়ারদরও লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছিল। পরবর্তী সময়ে চাহিদা ধীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি স্টকগুলো নিম্নমুখী রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় অ্যাপলের পাশাপাশি অ্যামাজন ও মেটার শেয়ারদরেও পতন হয়েছে। গত বছরের তুলনায় অ্যামাজন ও মেটার শেয়ারদর যথাক্রমে প্রায় ৫০ ও ৬৩ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে অ্যাপলের কমেছে প্রায় ৩১ শতাংশ। তার পরও ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য হারিয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি। মঙ্গলবার সংস্থাটির বাজারমূল্য ১ লাখ ৯৯ হাজার কোটি ডলারে নেমে আসে। এর আগে গত বছর মাইক্রোসফট ও জ্বালানি জায়ান্ট সৌদি আরামকো ২ লাখ কোটি ডলারের ক্লাব থেকে বেরিয়ে যায়।
২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের চারটি বৃহত্তম প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট কোম্পানি সম্মিলিতভাবে ৩ লাখ কোটি ডলারেরও বেশি বাজারমূল্য হারিয়েছে। রেকর্ড মূল্যস্ফীতি ও ক্রমবর্ধমান সুদের হারের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় প্রযুক্তি পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তবে অ্যাপলের শেয়ারদরে এ নিম্নমুখী প্রবণতা খুব গভীর হবে না বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। জাপানি ইলেকট্রনিকস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মুরাতার প্রেসিডেন্ট নরিও নাকাজিমা একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, স্টোরগুলোয় পণ্যের প্রাপ্যতার ভিত্তিতে শিগগিরই অ্যাপলের শেয়ারের নিম্নমুখী প্রবণতা বন্ধ হবে বলে মনে হচ্ছে। তাছাড়া এটা খুব গভীর হবে না বলে আশা করছি।
আগামী সপ্তাহে চতুর্থ প্রান্তিকের ফলাফল প্রকাশ করবে অ্যাপল। ডিসেম্বরে শেষ হওয়া প্রান্তিকে রেকর্ড বিক্রির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন বিশ্লেষকরা। তবে তারা এখন আশা করছেন, এ সময়ে সংস্থাটির বিক্রি কিছুটা কমে ১২ হাজার ২৯০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে।










