অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা পূর্বাভাস কমিয়েছে রফতানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব এবং অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বমুখী দাম ও চীনে করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণ মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে। মূলত এ কারণেই চাহিদা কমার পূর্বাভাস দেয়া হয়।

মাসভিত্তিক এক প্রতিবেদনে ওপেক জানায়, চলতি বছর অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা দৈনিক ৩৬ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল করে বাড়বে, যা আগের পূর্বাভাসের তুলনায় দৈনিক ৪ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল কম।

তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া তার প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনে সরাসরি আক্রমণ চালায়। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার পরই অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩৯ ডলারে উঠে আসে, যা ২০০৮ সালের পর সর্বোচ্চ। এমন পরিস্থিতিতে পণ্যটির বাজারে স্থিতি ফেরানোর উদ্যোগ নেয় যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশ। এসব দেশ কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুদ থেকে বাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহের ঘোষণা দেয়। এর পরই একের পর এক দাম কমতে থাকে। তবে দাম এখনো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের মধ্যেই রয়েছে।

প্রতিবেদনে ওপেক জানিয়েছে, চলতি বছর রাশিয়া ও ইউক্রেনের অর্থনীতি ভয়াবহ মন্দার মুখোমুখি হতে পারে। বিশ্বের বাকি দেশগুলোর অর্থনীতিতেও এ প্রভাব পড়বে।

সরবরাহজনিত সংকট ও কভিড-১৯ জনিত কারণে চীনে রসদ সরবরাহে বিলম্ব সামগ্রিকভাবে পণ্যবাজারে অস্থিতিশীলতা অব্যাহত রেখেছে। এসব বিষয় বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির হার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় নিয়ে যেতে সহায়তা করছে।

এমনকি চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক ব্যবহার দৈনিক ১০ কোটি ব্যারেল ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করছে ওপেক। সর্বশেষ ২০১৯ সালে বিশ্বজুড়ে দৈনিক ১০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ব্যবহার হয়েছিল।

ওপেক বলছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়েছে তার পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখছে মূল্যস্ফীতি। চলতি বছরের জন্য জোটটি বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস ৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। আগামীতে প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস আরো কমানো হতে পারে।

ওপেক ও এর মিত্র দেশগুলোর জোট ওপেক প্লাস নামে পরিচিত। রাশিয়া এ জোটের নেতৃস্থানীয় দেশ। জোটটি ২০২০ সালে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে গত বছর করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে জোটের সদস্যরা। গত বছরের মাঝামাঝি থেকে জোটটি মাসে দৈনিক চার লাখ ব্যারেল করে উত্তোলন বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে জোটটি। অন্যদিকে বাজারে স্থিতি ফেরাতে ওপেক প্লাসের প্রতি উত্তোলন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে বাইডেন প্রশাসন ও আরো কয়েকটি দেশ। যদিও এ আহ্বানে সাড়া দেয়নি ওপেক প্লাস।

সর্বশেষ বৈঠকে জোটটি আগামী মাসে দৈনিক ৪ লাখ ৩২ হাজার ব্যারেল করে উত্তোলন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা প্রায় আগের মতোই। অর্থাৎ যুদ্ধসহ অন্যান্য বিষয়ের কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সংকট প্রকট আকার ধারণ করলেও নিজেদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি ওপেক প্লাস।

অন্যদিকে ওপেকের বেশ কয়েকটি সদস্য দেশে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় কোটা অনুযায়ী উত্তোলন বাড়াতে পারছে না। এ কারণে জোটটি উত্তোলন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী পুরোপুরিভাবে জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে পারছে না।

ওপেকের প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে, গত মাসে জোটটির অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন দিনে শুধু ৫৭ হাজার ব্যারেল করে বেড়েছে। মোট দৈনিক উত্তোলন দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৮৫ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেলে। অথচ ওপেক প্লাসের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী জোটটির গত মাসে দৈনিক ২ লাখ ৫৩ হাজার ব্যারেল করে উত্তোলন বাড়ানোর কথা ছিল।