চীনের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিকারকরা বৈশ্বিক সরবরাহকারীদের সঙ্গে নতুন চুক্তির পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব চুক্তির অধীন বিভিন্ন দেশ থেকে এলএনজি আমদানি করা হবে। এমন প্রচেষ্টার মূল উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারে নিজেদের উপস্থিতি ও প্রভাববলয় বাড়ানো। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। 

চীনের গ্যাস ব্যবসায়ীরা নতুন নতুন বাণিজ্যিক ডেস্ক স্থাপন করছেন। সম্প্রসারণ করা হচ্ছে বিদ্যমান ডেস্কগুলোকেও। এলএনজির কেনাবেচা থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে এসব ডেস্কের মাধ্যমে। নতুন ডেস্ক স্থাপন বা সম্প্রসারণের মাধ্যমে চীনের ব্যবসায়ীরা এলএনজি বাণিজ্যে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টিই জানান দিচ্ছে। 

এসব ডেস্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে চীন সিঙ্গাপুর ও লন্ডনকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। কারণ শহর দুটি এলএনজিসহ বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যের বৃহৎ হাব। সেখানে ডেস্ক স্থাপনের মাধ্যমে চীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজেদের কৌশলগত অবস্থানকে আরো পোক্ত করছে। এমন উদ্যোগের ফলে শেল, বিপি, টোটালএনার্জিস ও ইকুইনরের মতো জ্বালানি জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চীনের ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। 

ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা জানান, চীনের আমদানিকারকরা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বাড়াচ্ছেন। বিশেষ করে কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত বছরের শেষ দিকের পর থেকে এসব চুক্তি প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। সে হিসেবে বার্ষিক চুক্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি টনেরও বেশি। এ দুটি দেশ থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে জ্বালানিটির আমদানি আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এছাড়া ওমান, কানাডা ও মোজাম্বিক থেকেও আমদানি বাড়ানোর কথা ভাবছে চীন।

বাজার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ফোটেন অ্যান্ড পার্টনার্স জানায়, চীনের কোম্পানিগুলো ২০২৬ সালের মধ্যে বছরে ১০ কোটি টনেরও বেশি এলএনজি আমদানি চুক্তির প্রত্যাশা করছে। বিষয়টি কয়েক বছরের মধ্যে দেশটির আমদানি লক্ষণীয় মাত্রায় বাড়ারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। 

দীর্ঘদিন ধরেই জাপান ছিল বিশ্বের শীর্ষ এলএনজি আমদানিকারক দেশ। কিন্তু চীন আমদানিতে দেশটিকে এরই মধ্যে ছাড়িয়ে গেছে। চীনে ক্রমবর্ধমান এলএনজি চাহিদা দেশটিতে শীর্ষ আমদানিকারক দেশের তকমা এনে দিয়েছে। দেশটি বর্তমানে রাশিয়ার দূরপ্রাচ্য ও আর্কটিক অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণে এলএনজি আমদানি করছে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনে অব্যাহত বাড়ছে গ্যাস উত্তোলন। পাশাপাশি রাশিয়া ও প্রতিবেশী মধ্য এশিয়ার দেশগুলো থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানি করছে দেশটি। এর মধ্য দিয়ে দেশটির কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে এলএনজির বাণিজ্য ও বিনিময়ে বৈচিত্র্য আনতে সক্ষম হচ্ছে। 

পাঁচ বছরের মধ্যে দেশটিতে এলএনজির চাহিদা মহামারীপূর্ব প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে সক্ষম হবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বেইজিং সরকারের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অধীন দেশটিতে বৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাস অবকাঠামো নির্মাণের সম্ভাবনা রয়েছে। মোট জ্বালানি ব্যবহারে গ্যাসের হিস্যা বাড়াতে আগ্রহী সরকার।

এশিয়ায় ছয় মাসের মধ্যে জুলাইয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) চাহিদা বেড়েছে প্রবলভাবে। পণ্যবাজার বিশ্লেষকপ্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যমতে, এশিয়ায় জুলাইয়ে জ্বালানিটির আমদানি হয়েছে ২ কোটি ১৮ লাখ ১৫ হাজার টন, যেখানে জুনে আমদানি হয়েছিল ২ কোটি ১২ লাখ ৮০ হাজার টন। জানুয়ারির পর ওই মাসেই সবচেয়ে বেশি এলএনজি আমদানি হয়েছে। জুলাইয়ে এশিয়ায় মোট আমদানি বেড়েছে ৫ লাখ ৭০ হাজার টন। 

এশিয়ার বড় আমদানিকারকদের মধ্যে চীনের চাহিদা বেশ কমই ছিল। জুলাইয়ে তারা আমদানি করেছে ৫০ লাখ ৯০ হাজার টন, যা জুনের ৪৮ লাখ ৫০ হাজার টনের চেয়ে হালকা বেশি। কিন্তু গত বছরের জুলাইয়ের ৬৭ লাখ ১০ হাজার টনের চেয় অনেক কম। দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের তৃতীয় বৃহৎ এলএনজি ক্রেতা। জুলাইয়ে তারা আমদানি করেছে ২৮ লাখ ১০ হাজার টন এলএনজি, যা জুনের ২৯ লাখ ২০ হাজার টন চেয়ে অল্প একটু কম। অন্যদিকে দামের বিষয়ে সংবেদনশীল ভারতে জুলাইয়ে আমদানি হয়েছে ১৮ লাখ ৪০ হাজার টন, যেখানে জুনে ছিল ১৭ লাখ ৭০ হাজার টন।